৮০০ কোটি টাকার বন্ড তদন্তে সিআইডি
- শ্রীপুর টাউনশিপে কেলেঙ্কারি

আধুনিক নগরায়ণের স্বপ্ন দেখিয়ে বন্ডের মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল বেক্সিমকো গ্রুপের আবাসন প্রতিষ্ঠান শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেড। রাজধানীর উপকণ্ঠে ‘মায়ানগর’ নামে আধুনিক টাউনশিপ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংগ্রহ করা এই অর্থের মধ্যে ৮০০ কোটিরও বেশি প্রকল্পে ব্যয় না করে আর্থিক কারসাজির মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এসব জালিয়াতি, ভুয়া তথ্য উপস্থাপন এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগের প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণ পাওয়ায় বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) পাঠানো হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেয়ারবাজারে গত দেড় দশকের অনিয়ম ও কারসাজি অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে ধারাবাহিকতায় ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর গঠিত বিশেষ অনুসন্ধান কমিটি গঠিত হয়। পরে ওই তদন্ত প্রতিবেদনের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল দুদকের সহকারী পরিচালক অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে শ্রীপুর টাউনশিপ, বেক্সিমকো ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বেক্সিমকো গ্রুপ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। একই সঙ্গে প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে ২৭ আগস্ট বিএসইসি তিন সদস্যের নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করে। গঠিত কমিটি বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান, ট্রাস্টি, নিরীক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন পর্যালোচনা করে জালিয়াতি, ভুয়া তথ্য উপস্থাপন আর্থিক অপরাধ এবং মানি লন্ডারিংয়ের প্রমাণ পায়।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম আগামীর সময়কে বলেছেন, তদন্তে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি প্রতারণা, জালিয়াতি ও সংঘবদ্ধ আর্থিক অপরাধের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় সম্পৃক্ত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এরই মধ্যে কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আর যেসব অভিযোগ ফৌজদারি তদন্ত প্রয়োজন, সেগুলো পাঠানো হয়েছে সিআইডিতে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, বন্ডটির শতভাগ গ্যারান্টার ছিল আইএফআইসি ব্যাংক, তাই ইস্যুকারী ব্যর্থ হলেও বিনিয়োগকারীদের মূলধন ও রিটার্ন পরিশোধের দায় ব্যাংকের ওপর বর্তাবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলেও বন্ডধারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকবে।
তদন্তে উঠে এসেছে, পাঁচ বছর মেয়াদি আইএফআইসি গ্যারান্টিড শ্রীপুর টাউনশিপ জিরো কুপন বন্ড অনুমোদনের অন্যতম শর্ত ছিল পর্যাপ্ত পরিশোধিত মূলধন থাকা। কাগজে-কলমে শ্রীপুর টাউনশিপ ৩৩৫ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন দেখালেও বাস্তবে সেই অর্থ কোম্পানির হিসাবে স্থায়ীভাবে ছিল না। একই অর্থ বারবার ব্যাংকে জমা ও উত্তোলনের মাধ্যমে কৃত্রিম মূলধনের চিত্র তৈরি করে বন্ড অনুমোদনের শর্ত পূরণ করা হয়। এটি ‘ফাইন্যান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর ছিল প্রথম ধাপ।
আর বন্ড বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পর শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের আর্থিক কারসাজি। তদন্তে দেখা গেছে, প্রকল্প উন্নয়ন ব্যয়ের নামে ৮০০ কোটির বেশি টাকা চুক্তিবদ্ধ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। কাগজে-কলমে এটি প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থপ্রদান হিসেবে দেখানো হয়। তবে তদন্ত চলাকালে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা বিএসইসিকে জানিয়েছে, তারা প্রকল্পে কোনো নির্মাণকাজ করেননি। বরং তাদের ব্যাংক হিসাবে আসা অর্থ সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষ ও শ্রীপুর টাউনশিপের ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বন্ড ইস্যুকারী শ্রীপুর টাউনশিপ এবং ঠিকাদার বেক্সিমকো ইঞ্জিনিয়ারিং— দুটি প্রতিষ্ঠানই একই গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। ফলে প্রকল্পের কাজের নামে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তর এবং পরে সেই অর্থ আবার উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এ ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অবস্থান। কারণ বন্ডটি ‘আইএফআইসি গ্যারান্টিড শ্রীপুর টাউনশিপ জিরো কুপন বন্ড’ হিসেবে ইস্যু করা হয়েছিল এবং এর শতভাগ গ্যারান্টার ছিল আইএফআইসি ব্যাংক। চুক্তি অনুযায়ী, ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান বন্ডের দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিনিয়োগকারীদের মূলধন ও নির্ধারিত রিটার্ন পরিশোধের দায়ভার গ্যারান্টার ব্যাংকের ওপর বর্তাবে। ফলে তদন্তে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হলেও বন্ডধারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকবে।
‘মায়ানগর’ নামে আধুনিক টাউনশিপ নির্মাণ প্রকল্পে ১৮ হাজার অ্যাপার্টমেন্টের পাশাপাশি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পার্ক, শপিংমল ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্পটির মালিকানায় বেক্সিমকোর ৭৫ শতাংশ এবং শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেডের ২৫ শতাংশ অংশীদারত্ব ছিল।




