আদনানের দুই বিওর লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা
- জেনেক্স শেয়ার বিক্রি হস্তান্তর স্থগিত
- অর্থ পাচারের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে ১৬টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট নির্মাণ করেছেন এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী কমিটির এই চেয়ারম্যান

বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে ১৬টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট নির্মাণের অপরাধে এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আদনান ইমামের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সম্প্রতি বিএসইসির কাছে একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন পাঠায় বিএফআইইউ। সেখানে আদনান ইমামের নিয়ন্ত্রিত শেয়ার হস্তান্তর ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়। সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসির নির্দেশে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) আদনান ইমামের দুটি বিও হিসাবের ডেবিট লেনদেন স্থগিত করেছে। বিএসইসি ও সিডিবিএল সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।
এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম আগামীর সময়কে বলেছেন, আদনান ইমামের বিরুদ্ধে বিএফআইইউর পাঠানো অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও সুপারিশ পর্যালোচনা করে কমিশনের পক্ষ থেকে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিও হিসাব থেকে জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার বিক্রি ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আরোপ করা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত ১২ আগস্ট ‘পাচারের অর্থে যুক্তরাজ্যে ১৬ বাড়ি!’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে আগামীর সময়। সেখানে তুলে ধরা হয় আদনান ইমামের বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র।
সিডিবিএলের নির্দেশনায় জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ারধারণকারী আদনান ইমামের সংশ্লিষ্ট বিও হিসাবগুলোর ডেবিট লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে। এসব হিসাব থেকে শেয়ার বিক্রি বা অন্যত্র স্থানান্তরের সুযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। গত ২১ জুলাই বিএসইসিতে চিঠি পাঠায় বিএফআইইউ। পরে ৪ আগস্ট বিএফআইইউর অনুরোধে সিডিবিএলকে চিঠি দেয় বিএসইসি। এ নির্দেশনায় আদনানের সংশ্লিষ্ট বিও হিসাবগুলোর লেনদেন স্থগিত করে সিডিবিএল।
সূত্রে জানা গেছে, ডিএসএফএম সিকিউরিটিজ (বিও-১২০২৯৮০০৩৭১০৩৫৫১) এবং সিটি ব্রোকারেজে (বিও-১২০৪৫০০০৩৭১০৩৫৫১) সক্রিয় লিংক বিও হিসাবে থাকা আদনান ইমামের জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার ছিল। তার ওই দুটি বিও হিসাবে লেনদেনের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও আদনানের প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজ এবং লংকাবাংলা সিকিউরিটিজে বিও হিসাব রয়েছে। তবে তার চারটি বিও আইডির মধ্যে তিনটি হিসাব এখনো সক্রিয় রয়েছে। বাকি একটি বিও হিসাব আগেই বন্ধ করা হয়েছে। ওই বিও হিসাবগুলোর মধ্যে দুটি আইডিতে জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার থাকায় সেগুলোর লেনদেনে স্থগিতাদেশ রয়েছে।
বিএফআইইউ প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, আদনান ইমামের নামে যুক্তরাজ্যে ১৬টি বাড়ি ও ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছে বিএফআইইউ। দেশ থেকে পাচারের অর্থে এ সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, নিজস্ব প্রতিষ্ঠান জেনেক্স ইনফোসিসের নামে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে আদনান ৩১৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ভিন্ন খাতে স্থানান্তর করেন। ইউসিবির সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান রনি ও আদনান বন্ধু। পারস্পরিক যোগসাজশে বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে জেনেক্স ইনফোসিসের অনুকূলে ইউসিবি থেকে দেওয়া হয়েছিল হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ।
সর্বশেষ তথ্যমতে, ইউসিবি থেকে জেনেক্স ইনফোসিস প্রতিষ্ঠানে ৩১৫ দশমিক ২০ কোটি টাকার ফান্ডেড এবং নন-ফান্ডেড সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু ওই ঋণ বিতরণে ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা, নগদপ্রবাহ, ব্যবসার বাস্তব অবস্থা, জামানতের পর্যাপ্ততা এবং ঋণের অর্থের ব্যবহার কার্যকরভাবে তদারকি করা হয়নি বলে বিএফআইইউর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঋণের অর্থ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না হয়ে বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর, পুরনো ঋণ সমন্বয়, পুনঃতফসিলের ডাউনপেমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণ আড়াল করা হয়েছে। একধরনের জালিয়াতির মাধ্যমে আড়াল করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত আর্থিক চিত্র।
এই অনুসন্ধান করা হয় ২০২১-২৪ সাল পর্যন্ত। এ সময় ওই প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ইস্যু করা অধিকাংশ এলসি ফোর্স লোন, টার্ম লোন ও টাইম লোনে রূপান্তরের মাধ্যমে সমন্বয় দেখানো হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমদানি করা পণ্য ব্যবসায় ব্যবহৃত হয়নি এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ ব্যাংকে ফেরত আসেনি। এতে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে বিদেশে পাচার করা হয় ওই ঋণের অর্থ। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ওয়ার্ক অর্ডার ফাইন্যান্স হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে ২৯ কোটি টাকার কার্যাদেশ সমাপনান্তে ব্যাংকে ফেরত না আসার বিষয়টি সন্দেহজনক। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণস্থিতি (প্রায় ১০১৭ কোটি টাকা) অনাদায়ী এবং মন্দমানের খেলাপি ঋণ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আদনান পলাতক। তিনি ইংল্যান্ডের (পাসপোর্ট নং-১২৪৩৩৮-৩৯৭) নাগরিক।






