ঋণগ্রস্ত সিটি গ্রুপকে শেয়ারবাজারে আনতে তোড়জোড়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গত কয়েক বছর ধরে দেশের শেয়ারবাজারে ভালো ও সম্ভাবনাময় নতুন কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আসার হার প্রায় শূন্যের কোঠায়। ভালো শেয়ারের অভাবে বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অধিকাংশ সময় দুর্বল, বন্ধ বা অস্তিত্বহীন কোম্পানির শেয়ার কিনে ধারাবাহিকভাবে মূলধন হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শেয়ারবাজারে যখন মানসম্পন্ন ও ভালো লভ্যাংশ দেওয়ার মতো কোম্পানির তীব্র সংকট, ঠিক তখনই প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণের বোঝা এবং তারল্য সংকটে ধুঁকতে থাকা সিটি গ্রুপকে শেয়ারবাজারে আনার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বাজারের এ খরা ও নাজুক পরিস্থিতিতে সিটি গ্রুপের মতো আর্থিক সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কতটুকু উপকারে আসবে, তা নিয়ে জোর প্রশ্ন তুলেছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি শেয়ারবাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যে ইস্যু ম্যানেজার ও ব্যাংকিং পার্টনার নিয়োগ দিয়েছে সিটি গ্রুপ। অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশি-বিদেশি ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার পাহাড়সম ঋণ নিয়ে একসময়ের সফল শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের আজকের এ সংকটে পড়ার পেছনে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণ রয়েছে। বহু বছর ধরে প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমানের একক ও দূরদর্শী নেতৃত্বে পরিচালিত হলেও, ২০২৩ সালে তার প্রয়াণের পর গ্রুপটিতে রূপান্তরকালীন নেতৃত্ব শূন্যতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দেখা দেয় দুর্বলতা।
পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেও দীর্ঘদিন গ্যাস ও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোগত সংযোগ না পাওয়ায় বিশাল মূলধন আটকে গিয়ে আয়হীন বোঝার সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধপরবর্তী ডলারের তীব্র সংকট ও মূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, যার ফলে আমদানিনির্ভর এই গ্রুপের কাঁচামাল সংগ্রহের খরচ এক লাফে বহুগুণ বেড়ে যায়। মূলত প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের প্রয়াণ, সময়মতো অবকাঠামো না পাওয়ায় বিনিয়োগের অর্থ আটকে থাকা এবং টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের মতো আঘাত সামলাতে না পেরেই একসময়ের সফল ব্যবসার আজ এই তারল্য ও ঋণ সংকটপূর্ণ পরিণতি হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আল-আমিন বললেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছি যেন শেয়ারবাজারে ভালো প্রবৃদ্ধি ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি আনা হয়, যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লাভবান হতে পারেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাজারে ভালো কোনো কোম্পানি আসছে না। এমন পরিস্থিতিতে সিটি গ্রুপের মতো বিপুল ব্যাংক ঋণগ্রস্ত এবং ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিহীন একটি প্রতিষ্ঠানকে বাজারে আনলে বাজার ও বিনিয়োগকারী— উভয়ই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমানে সিটি গ্রুপের এমন কোনো পরিস্থিতি নেই যে, ব্যাংকগুলো তাদের নতুন করে ঋণ দেবে আর ঠিক এ কারণেই তারা মূলধন সংগ্রহ করতে শেয়ারবাজারে আসছে। আমরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সচেতন ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছি।’
গত কয়েক বছরে ঋণের চাপ ও ব্যবসা পরিচালনগত ধাক্কায় গ্রুপটির আর্থিক ভিত্তি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেশি-বিদেশি ৩৬টি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম গ্রুপটির ঋণ পুনর্গঠন ও জরুরি অর্থায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে প্রতিষ্ঠানটি রক্ষা পায় খেলাপি হওয়া থেকে।



