ঋণ পরিশোধের সংকট সামনে

ফাইল ছবি
একসময় বিদেশি ঋণ ছিল দেশের উন্নয়নযাত্রার অন্যতম ভরসা। সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে নেওয়া সেই ঋণ এখন ধীরে ধীরে পরিশোধের পর্যায়ে পৌঁছেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, আগামী কয়েক বছরে এই ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে সরকারের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। ঋণের মেয়াদপূর্তি, বিভিন্ন ঋণের রেয়াতকাল শেষ হওয়া এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। সরকারের নিজস্ব নীতিপত্রেও এই ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী শফিকুল আযম বলেছেন, বিদেশি সংস্থা বা কোনো দেশের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই পরিশোধ করতে হয়। তাই সরকারকে প্রতি বছর ঋণের কিস্তি, সুদ এবং অন্যান্য বৈদেশিক দায় পরিশোধের জন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দ রাখতে হয়। তিনি বলেছেন, সরকার শুধু বৈদেশিক ঋণ নয়, দেশীয় ঋণ পরিশোধেও সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। ফলে ঋণ পরিশোধের বিষয়টি অবহেলার কোনো সুযোগ নেই; বরং পরিকল্পিতভাবে ঋণ ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
তিনি আরও বলেছেন, বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার আগে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে, যে প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তা থেকে প্রত্যাশিত ফল আসবে কি না। প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত আয় বা অর্থনৈতিক সুফল না এলে সেই ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই বর্তাবে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে বৈদেশিক ঋণের আসল পরিশোধে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২৬১ কোটি ৪০ লাখ ডলার বা প্রায় ৩১ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পরিমাণ বেড়ে ৩১৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা প্রায় ৩৮ হাজার ৩৫২ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। পরবর্তী বছরগুলোতে এই চাপ আরও বাড়বে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৪২৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৪২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার আসল পরিশোধ করতে হতে পারে।
সরকারের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশেষ করে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এ কারণে বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় হেজিংসহ বিভিন্ন আর্থিক উপকরণ ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে সরকার। বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৩৮ শতাংশ মার্কিন ডলারে, ৩৩ শতাংশ এসডিআরে, ২০ শতাংশ জাপানি ইয়েনে, ৫ শতাংশ ইউরোতে, ৩ শতাংশ রেনমিনবিতে এবং বাকি ১ শতাংশ অন্যান্য মুদ্রায় রয়েছে।
তবে অর্থ বিভাগের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সরকারি ঋণের অবস্থান এখনো সামগ্রিকভাবে টেকসই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঋণ-জিডিপি অনুপাত মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রধান ঋণ সূচকগুলো ঝুঁকিসীমার নিচে আছে। যদিও বৈদেশিক ঋণ-রপ্তানি অনুপাত নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। রপ্তানি আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে মধ্যমেয়াদে ঋণ ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে নতুন ঋণ ঝুঁকি বিশ্লেষণ (ডিএসএ) পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, বাজেট ঘাটতি কমানো এবং ঋণনির্ভরতা হ্রাসের মাধ্যমে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের মতে, অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করে এবং বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করে। তাই মধ্যমেয়াদে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমানো হবে। তবে ঋণের সুদ পরিশোধ, পুনঃঅর্থায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় অব্যাহত রাখার কারণে স্বল্পমেয়াদে এই নির্ভরতা কিছুটা বেশি থাকতে পারে।
এই বাস্তবতায় স্বল্পমেয়াদে সরকারের অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন কিছুটা বাড়তি থাকবে, তবে তার সার্বিক গতিমুখ হবে নিম্নমুখী। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার দুটি পদক্ষেপে অঙ্গীকারবদ্ধ। সরকারি ব্যয়ের মান ও উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করা, যাতে প্রতিটি ঋণের বিপরীতে অর্থনীতিতে আয় আসে এবং ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া রাজস্ব সংস্কারের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে বাজেট ঘাটতি সংকুচিত করা। রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পেলে এবং ঘাটতি কমলে মোট বাজেট ঘাটতি ও জিডিপি উভয়ের অনুপাতে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।


