সাক্ষাৎকার
জ্বালানি নিশ্চিত হলে রপ্তানি বাড়বে বহুগুণ

মইনুল ইসলাম, সভাপতি, বিসিএমইএ
একসময় সিরামিক, টাইলস ও স্যানিটারি সামগ্রীর চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হতো বাংলাদেশকে। তবে গত দুই থেকে আড়াই দশকে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিপুল বিনিয়োগে বদলে গেছে সেই চিত্র। কাঁচামালের সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে মানসম্মত পণ্য তৈরি করছে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। অগ্রাধিকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সিরামিক পণ্যের রপ্তানি আরও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি এবং মুন্নু সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম। সম্প্রতি সিরামিক খাতের বৈশ্বিক সম্ভাবনা, প্রযুক্তিগত সাফল্য এবং বর্তমান সংকট নিয়ে আগামীর সময়ের কাছে বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেছেন তিনি।
বিসিএমইএ সভাপতি মইনুল ইসলাম জানিয়েছেন, গত ২৫ বছরের ব্যবধানে দেশীয় সিরামিক পণ্যের গুণগত মান ও প্রযুক্তিতে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে গড়ে ওঠা শীর্ষস্থানীয় টাইলস ও স্যানিটারি কারখানাগুলোর পণ্যের মান আমদানি করা যেকোনো আন্তর্জাতিক পণ্যের সমান, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও উন্নত।
বর্তমানে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে এ খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। দেশের চাহিদা মেটানোর পর এখন কারখানায় উদ্বৃত্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। শুধু আভিজাত্য প্রকাশ বা মানসিক সন্তুষ্টির কারণে কিছু ক্রেতা আমদানি করা পণ্য ব্যবহার করলেও, গুণগত বিচারে দেশীয় পণ্যের অবস্থান এখন শীর্ষে। তা ছাড়া আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে স্পেয়ার পার্টস বা মেকানিজম নষ্ট হলে তা মেরামত করা জটিল ও ব্যয়বহুল, অথচ দেশীয় পণ্য অত্যন্ত টেকসই, সহজে রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী।
বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে তীব্র অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সংকটের মুখে পড়েছে এ খাত
উৎপাদনে উদ্বৃত্ত সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ফলে বিদেশি বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন এই উদ্যোক্তা। সিরামিকের মধ্যে ‘টেবিলওয়্যার’ (থালা-বাসন) এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সফল রপ্তানি পণ্য হিসেবে স্থান করে নিয়েছে এবং বিশ্ববাজার থেকে প্রচুর কাজের অর্ডার পাচ্ছে।
টেবিলওয়্যারের এই সাফল্য দেখে এখন টাইলস ও স্যানিটারি সামগ্রী রপ্তানি বাড়াতে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ শুরু করেছেন। মইনুল ইসলাম বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারখানার ডাইস (ছাঁচ) ও ডিজাইনে সামান্য পরিবর্তন আনলেই বিশাল রপ্তানি বাজার দখল করা সম্ভব। শেরাটন, হিলটন বা প্যান প্যাসিফিকের মতো আন্তর্জাতিক চেইন হোটেলগুলোর বৈশ্বিক টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে দেশীয় কারখানাগুলো প্রতিযোগিতামূলক দামে সেই উচ্চমানের পণ্য সরবরাহ করতে সম্পূর্ণ সক্ষম।
বিদ্যমান সংকট মোকাবিলা এবং উৎপাদন খরচ কমাতে কারখানাগুলোয় ব্যাপক অপচয় রোধ ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। উৎপাদনে ব্যবহৃত পানি ড্রেন দিয়ে ফেলে না দিয়ে তা রিসাইকেল করে আবার প্রক্রিয়া কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি সামান্য ত্রুটি থাকা ভাঙা পণ্যগুলোকেও পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালে রূপান্তর করা হচ্ছে।
এর একটি বিশেষ উদাহরণ দিয়ে মইনুল ইসলাম জানিয়েছেন, টাইলসের ছাঁচ তৈরিতে ব্যবহৃত ‘প্লাস্টার অব প্যারিস’ কাজ শেষে আগে ফেলে দেওয়া হতো। এখন কারখানাগুলো তা সংগ্রহ করে চক ও স্লেট প্রস্তুতকারকদের কাছে বিক্রি করছে। এমনকি একটি কারখানা নিজস্ব উদ্যোগে বর্জ্য প্লাস্টার অব প্যারিস থেকে চক ও স্লেট তৈরি করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাথমিক স্কুলগুলোয় সরবরাহ শুরু করেছে।
বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সিরামিক খাত বর্তমানে তীব্র অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সংকটের মুখে পড়েছে। সিরামিক শিল্পের প্রধান কাঁচামালই হচ্ছে গ্যাস। সিরামিক বা কেমিক্যাল প্রক্রিয়ায় গ্যাস শুধু জ্বালানি নয়, এটি র-ম্যাটেরিয়াল।
ভোলা ও হবিগঞ্জ অঞ্চল ছাড়া দেশের প্রায় সব জায়গায় গ্যাসের তীব্র স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত প্রেশার না থাকায় অনেক কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গ্যাসের চাপ কমলে সাময়িকভাবে এলপিজি এনে বাড়তি খরচে চালানো কিংবা সোলার বসিয়ে অন্যান্য মেশিন চালনা করা সম্ভব হলেও মূল প্রিন্টিং ও কেমিক্যাল প্রসেসিং গ্যাস ছাড়া অসম্ভব। এর ওপর কারখানা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও প্রতি ১৫ দিন পরপর বাধ্যতামূলক বিল পরিশোধের নিয়ম উদ্যোক্তাদের চরম অর্থসংকটে ফেলছে।
একই সঙ্গে স্থানীয় আবাসন খাতের স্থবিরতা সিরামিক, টাইলস, স্যানিটারি, রড ও সিমেন্টশিল্পের ওপর সরাসরি আঘাত এনেছে। সার্বিক মন্দার সময় আবাসনের ওপর কেবিনেট ট্যাক্স নির্ধারণকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে বিসিএমইএ সভাপতি বলেছেন, এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাণিজ্যে কিছুটা টানাপড়েন ভোগ করতেই হবে।
জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকারের সাম্প্রতিক সলিউশন প্রস্তাব হিসেবে ‘আইএসও ট্যাংক’ বা বহনযোগ্য স্পেশালাইজড ট্যাংকের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেছেন, এই পদ্ধতিতে পরিবহনজনিত অপচয় ও অনিয়ম বন্ধ করে সরাসরি বড় শিল্পে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব। এতে সিস্টেম লস ও দুর্নীতি এড়ানো সম্ভব হবে।
উদ্যোক্তাদের মূল দাবি— সরকার যেন সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, তারা ঠিক কতটুকু গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে এবং তার মূল্য কেমন হবে। সরবরাহ নিশ্চিত না করে নতুন কারখানায় গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মইনুল ইসলাম।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিরামিকের মতো উদীয়মান ও দেশীয় উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে দেশীয় চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত পণ্য রপ্তানি করে এই শিল্প বিশ্ববাজার থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।




