আইএমএফের ঋণ পেতে বাড়ছে ভ্যাট
- ২০৩০ সালের মধ্যে প্রত্যাহার হবে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা
- চালু হবে একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার
- দাম বাড়বে অনেক পণ্যের

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে রাজস্ব খাতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে সব ধরনের ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) অব্যাহতি সুবিধা। একই সঙ্গে দেশ জুড়ে চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে শতভাগ একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার।
বর্তমানে পাঁচ শতাধিক পণ্য ও সেবায় ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট আদায় করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ আদেশের (এসআরও) মাধ্যমে পুরোপুরি ভ্যাট মওকুফ রয়েছে। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত করতে এসব সুবিধা তুলে নিয়ে ঢালাওভাবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসানো হলে দৈনন্দিন জীবনের বিশাল প্রভাব পড়বে। বাড়বে পণ্য ও সেবার দাম।
বিশেষ করে বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিকস, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার ও প্রযুক্তিপণ্য, মেট্রোরেলের টিকিট ও রেস্তোরাঁ সেবা, ব্র্যান্ড ও ব্র্যান্ডবিহীন পোশাক, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও স্যানিটারি সামগ্রীর দাম বেড়ে যাবে কয়েক গুণ।
তবে এনবিআর জানিয়েছে, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানো ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার চিন্তা রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহন খাতের মতো সংবেদনশীল খাতগুলোয় ভ্যাট ছাড় বা বিশেষ সুবিধা অব্যাহত থাকতে পারে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ পেতে চারটি শর্ত কমন থাকে। সে গুলো হলো— কর অব্যাহতি প্রত্যাহার, কর যৌক্তিকীকরণ, কর আদায় প্রক্রিয়া সহজ এবং কর-জিডিপি হার বৃদ্ধি করা। সরকার সংস্থাটির সঙ্গে নতুন করে ঋণচুক্তি করতে যাচ্ছে। সে জন্য তাদের শর্ত অনুযায়ী রাজস্ব খাতে বেশ কিছু সংস্কার করতে হবে। তবে সংস্কারের সময় দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করবে। এ সফরেই নতুন ঋণ ও রাজস্ব সংস্কারের রূপরেখা মূল্যায়ন করা হবে। নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে আইএমএফের কারিগরি কমিটির কাছে ভ্যাট অব্যাহতি কমানোর এ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং কর অব্যাহতি প্রত্যাহারের বিষয়ে আইএমএফের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক বছরে কীভাবে এ সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে, তার একটি রূপরেখাও উপস্থাপন করেছে এনবিআর।
এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের এক কর্মকর্তা জানালেন, বর্তমানে পাঁচ শতাধিক পণ্য ও সেবা বিভিন্ন হারে কম ভ্যাট সুবিধা অথবা সম্পূর্ণ অব্যাহতি পাচ্ছে। এসআরওর মাধ্যমে দেওয়া এসব সুবিধার অনেকটি নির্দিষ্ট মেয়াদ ও শর্তের আওতায় রয়েছে। ২০৩০ সালের পর এসব সুবিধার মেয়াদ আর না বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে অব্যাহতি কমানোর বিষয়ে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার তালিকা নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে বিশেষ ভ্যাট সুবিধা পাওয়া পণ্য ও সেবার মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিকস, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক পণ্য, সমুদ্রগামী জাহাজ পরিচালনা, মেট্রোরেল সেবা, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্য, রেস্তোরাঁ, ব্র্যান্ডবিহীন পোশাক, স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব খাতের অনেক ক্ষেত্রে ভ্যাটের হার বাড়তে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে কোন পণ্য ও সেবায় কত হারে ভ্যাট বাড়বে, কোন খাতে ছাড় বহাল থাকবে এবং কখন থেকে তা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পুরো পরিকল্পনাটিও প্রস্তাব ও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বললেন, সরকারের মোট কর অব্যাহতির পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যেখানে রাজস্ব আদায় জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অতীতেও সরকার ভ্যাট অব্যাহতি কমানো ও রাজস্ব সংস্কারের বিষয়ে একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেগুলোর উল্লেখযোগ্য বাস্তবায়ন হয়নি। এবারও একই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে তা কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। তিনি বললেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়নের পরিকল্পনা দেওয়া হলেও আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি ওই সময় পর্যন্ত চলার কথা নয়। তাই কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সরকার কী কী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে পারবে, সে বিষয়ে সংস্থাটি সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার ও ব্যাখ্যা চাইবে।
জাহিদ হোসেনের মতে, ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহার করলে কত অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় হবে, সরকারকে তার হিসাবও তুলে ধরতে হবে। শুধু অব্যাহতি কমানোর ঘোষণা নয়, কোন খাতে কত রাজস্ব বাড়বে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করেছিল আইএমএফ। ওই কর্মসূচির আওতায় রাজস্ব প্রশাসন, ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে সম্মত শর্তগুলোর অনেকটি বাস্তবায়নে অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় কম। নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনায় তাই রাজস্ব সংস্কারের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও সময়সীমাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



