ডব্লিউডিডিএফের সেমিনার
প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা প্রাপ্তির দাবি

নারীদের জন্য সব ধরনের সেবা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহজলভ্য, নিরাপদ ও অধিকারভিত্তিক করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘প্রতিবন্ধী নারীদের অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা প্রাপ্তি’ শীর্ষক সেমিনার।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার ভবনের আজিমুর রহমান কনফারেন্স হলে বিদেশি দাতা সংস্থা FJS ও DRF-এর অর্থায়নে এবং Women with Disabilities Development Foundation (WDDF)-এর আয়োজনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন WDDF-এর চেয়ারপারসন শিরীন আক্তার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট কো-অর্ডিনেটর শারমিন আক্তার দোলন।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, ‘আমরা সব সময় দেখি, ঐচ্ছিক বিষয়ের মতো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করা হয়। আর তিনি যদি নারী হন, তাহলে তো কথাই নেই। প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তারা এগিয়ে যেতে পারবেন না। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের জন্য রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘ডব্লিউডিডিএফে ৩৩ জন মানুষ আছেন। তাঁদের মধ্যে ৩২ জন নারী (প্রতিবন্ধী) এবং একজন পুরুষ। প্রতিবন্ধী মানুষ যদি শিক্ষিত হন, তাঁরা কাজ করতে পারেন। আমাদের সংগঠনের সদস্যরাই তার প্রমাণ।’
WDDF-এর চেয়ারপারসন শিরীন আক্তার বলেন, ‘এই সরকার আসার আগে আমরা অনেক দিন হতাশায় ছিলাম—আমাদের দাবিগুলো কোথায় জানাব? এই সরকারের আমলে একটি বাস্তবায়ন কমিটি হয়েছে। আমরা অনেক দিন ধরে এটিই চাচ্ছিলাম। সেখানে আমাদের দাবিগুলো জানাতে পারব। আমরা আশাবাদী, এই বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দাবিগুলোর সমাধান হবে।’
এবিএফের চেয়ারপারসন মহুয়া পাল বলেন, ‘আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে কাজ করছি। প্রতি বছর বাজেট নিয়ে ক্যাম্পেইন করি। বাজেট নিয়ে কাজ করি। কিন্তু আমাদের যে দাবিগুলো আছে, তা ঠিকমতো পূরণ হয় না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচল ও যানবাহনের ক্ষেত্রে মেট্রোরেল ছাড়া কোনো সুযোগ নেই। আমরা সহজভাবে ও নিরাপদে চলাচল করতে চাই।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রেজাউল করিম সিদ্দিকী বলেন, ‘আমাদের দেশে ভিকটিমকেই প্রমাণ করতে হয়, ঘটনা কীভাবে ঘটেছে এবং কী অপরাধ হয়েছে। সম্প্রতি একটি রায়ে প্রমাণের অভাবে অনেক অপরাধী খালাস পেয়ে গেছে। এর আরেকটি কারণ মামলায় দীর্ঘসূত্রতা।’
ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি বিশেষজ্ঞ ভাস্কর ভট্টাচার্য বলেন, ‘সকল প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ই-সেবা চালু করতে হবে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য পাসপোর্ট করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা বা প্রক্রিয়াটি সহজ করার কথা ভাবতে হবে।’
সাইটসেভার্স বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ও কিশোরীরা বেশি বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। এটি অনেকটা চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও আর্থ-সামাজিক নানা দিক থেকে তারা মোটামুটিভাবে বিচ্ছিন্ন। এগুলো নিয়ে যদি মনোযোগ দেওয়া যায় এবং বিষয়গুলোকে যথাযথভাবে মোকাবিলা করা যায়, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সমতাভিত্তিক সমাজ চাই। এটি কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। এসব বিষয় মাথায় রেখে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চ্যারিটির মর্যাদায় না রেখে অধিকারভিত্তিক মর্যাদায় রাখার দাবি জানিয়ে আসছি।’
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাবিনা নাসরিন বলেন, ‘আমরা সবাই নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কাজ করি। এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীরা তাঁদের আন্দোলনের মাধ্যমে নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছেন। আমি তাঁদের স্যালুট জানাই।’
তিনি বলেন, ‘নারীদের জন্য অনেক আইন থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয় না। এর প্রধান কারণ যথাযথ জবাবদিহিতার অভাব। যার যার দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করা হয় না। ফলে প্রান্তিক মানুষ সেবা পান না বললেই চলে। বিভিন্ন বাজেট হয়, টাকা আসে। এসব টাকা ঠিক জায়গায় খরচ হয় কি না, তা মনিটর করা প্রয়োজন।’
ভিত্তি স্থপতি বৃন্দ লিমিটেডের স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল হাবিব বলেন, ‘সরকারি ভবন, পার্ক, খেলার মাঠ, রাস্তা ও অন্যান্য জোনের পরিকল্পনা ও নকশা এমনভাবে করতে হবে, যাতে সেগুলো সার্বজনীনভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়। দেশে অসংখ্য ভবন ও নগরায়ণ হয়েছে। এসব ভবনে সার্বজনীন ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা আছে কি না, তা অডিট করে দেখতে হবে। প্রতিবন্ধীদের জন্য সার্বজনীন ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’
WDDF-এর প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট কো-অর্ডিনেটর শারমিন আক্তার দোলন বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের জন্য নানা আইন আছে; তা শুধু কাগজে-কলমে না রেখে বাস্তবে নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা বা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এগুলো তাঁদের অধিকার।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে প্রতিবন্ধী মানুষকে কোনো করুণা বা বোঝা হিসেবে নয়, বরং অধিকারসম্পন্ন একজন নাগরিক এবং সমাজের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখা হবে। আইন, নীতি ও বাজেটের পাশাপাশি তাঁদের নিজেদের যে কণ্ঠ রয়েছে, সেটিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় আনতে হবে।’
ইউএন উইমেনের ন্যাশনাল প্রজেক্ট সাপোর্ট অফিসার নাজমা আরা বেগম পপি বলেন, ‘বাংলাদেশে নারীদের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে আইনের অভাব নেই। তারপরও প্রতিবন্ধী নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। আমরা তাঁদের সুরক্ষা দিতে পারছি না। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের অনেক মামলায় গিয়েছি। আমি দেখেছি, আমাদের প্রতিবন্ধী অধিকার সুরক্ষা আইন, ২০১৩-তে অনেক কিছু স্পষ্ট নয়।’
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত প্রতিবন্ধী নারী আনিলা বলেন, ‘বার এক্সাম পরীক্ষায় সময়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ২০ মিনিট সময় দেওয়া হয়। এর চেয়ে আরও সময় বাড়িয়ে দিতে হবে।’
তিনি জানান, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারসংক্রান্ত আইন নিয়ে তিনি একটি তুলনামূলক গবেষণা করছেন। সেখানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের পরে নেপালে প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য যে আইন করা হয়েছে, সেখানে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী নারীদের বিষয়ে আইনে বিষয়গুলো স্পষ্ট নয়। এটি পর্যালোচনা করা দরকার বলে তিনি জানান।
প্রতিবন্ধী নারী অনামিকা বলেন, ‘করোনার পর থেকে প্রতিবন্ধী নারীরা গ্রামে কী যে কষ্টে আছেন, আপনারা না গেলে বুঝবেন না। আমি দিনাজপুরের উত্তরাঞ্চলের গ্রামে কাজ করি। এখন প্রতিবন্ধী নারীদের শিক্ষার সুযোগ থাকলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই কম। তাঁরা অনাহারে জীবনযাপন করছেন।’
এসব প্রতিবন্ধী নারীর জন্য সরকারের দায়িত্ব ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের প্রতি আরও নজর দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহুয়া পাল, চেয়ারপারসন, এবিএফ; ব্যারিস্টার আয়েশা আক্তার, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; রেজাউল করিম সিদ্দিকী, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; ভাস্কর ভট্টাচার্যী, কনসালটেন্ট ও ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি এক্সপার্ট, বাংলাদেশ; আনিকা রহমান লিপি, সহকারী পরিচালক, সেন্টার ফর ডিজেবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট (CDD); এবং নাজমা আরা বেগম পপি, ন্যাশনাল প্রজেক্ট সাপোর্ট অফিসার, UN Women Bangladesh।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শাহ মোহাম্মদ মাহবুব, মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব), সমাজসেবা অধিদপ্তর; মো. আশরাফুল ইসলাম, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (চলতি দায়িত্ব), রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা; মোহাম্মদ মসিউর রহমান, নির্বাহী পরিচালক (সচিব), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়; ইকবাল হাবিব, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ভিত্তি স্থপতি বৃন্দ লিমিটেড; শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (MJF); এবং অমৃতা রেজিনা রোজারিও, কান্ট্রি ডিরেক্টর, সাইটসেভার্স বাংলাদেশ।
সেমিনারে প্রধান অতিথি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে যখন কোনো কমিটি হবে, আলোচনা হবে, সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অবশ্যই থাকবেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করার জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে এ মাসে আটটি অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আমরা বসব। সারা দেশে সাড়ে ৩৪ লাখ প্রতিবন্ধীকে প্রতি মাসে ৯০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হতো। এ বছর বাড়িয়ে ৩৮ লাখ প্রতিবন্ধীকে ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে সরকার।’
সেমিনারে প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য বিদ্যমান সেবা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি ও প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী নারীদের অধিকার, মর্যাদা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, পেশাজীবী এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
WDDF-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সেমিনার প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সংলাপ ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন আয়োজকরা।







