জুন থেকেই কার্যকর
১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়তে পারে বিদ্যুতের দাম, বুধবার ঘোষণা

সংগৃহীত ছবি
এপ্রিলে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বেড়েছে পরিবহন ভাড়া। এ মাসে আরেক দফা বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম। এবার বিদ্যুতের দামও বাড়ছে। আগামীকাল বুধবার নতুন দর ঘোষণা করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), যা কার্যকর হতে পারে চলতি মাস থেকেই। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
গতকাল সোমবার বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘কমিশনের কাজ প্রায় শেষের দিকে। আশা করছি দ্রুত বিদ্যুতের নতুন দর ঘোষণা করা হবে।’ বিদ্যুতের দাম কী পরিমাণ বাড়তে পারে সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি কমিশন চেয়ারম্যান।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা আভাস দিয়েছেন, পাইকারি ১৯ থেকে ২০ শতাংশের মতো, আর গ্রাহক পর্যায়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বিদ্যুতের দাম।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা উঠলেও সরকারের ঘোষণা ছিল দাম না বাড়ানোর। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির বাজার অস্থির হয়ে উঠলে সেই অবস্থান থেকে সরে আসে সরকার।
এখন সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাধ্য হয়েই জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। আর বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়ার কারণ উচ্চমূল্যের জ্বালানি আমদানিতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং পাহাড়সম ভর্তুকির চাপ সামলানো। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ খাতে নানান অনিয়ম-দুর্নীতি, অসম চুক্তি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ এবং অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে আসছেন বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম কম থাকার সময় ১০ বছর ধরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন যে বিপুল পরিমাণ মুনাফা করেছে তা দিয়ে সমন্বয় করা হলে এখন জ্বালানির দাম বৃদ্ধি না করলেও চলত।
বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম ঘাটতি। এই ঘাটতিকে ভিত্তি করে মূল্য সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই। আগে বের করতে হবে ঘাটতির প্রকৃত কারণ, ঠিক করতে হবে বৈধতা, বাদ দিতে হবে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়। এরপর যদি বাস্তবেই ঘাটতি থাকে, তবেই শুধু মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
তাদের মতে, এই পদক্ষেপে সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমলেও বাড়বে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়লে পাল্লা দিয়ে বাড়বে উৎপাদন খরচও। প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়বে নিত্যপণ্যের ওপর। ফলে মূল্যস্ফীতির এই বাজারে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে পড়তে পারে আরও কঠিন।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলছিলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম ঘাটতি। এই ঘাটতিকে ভিত্তি করে মূল্য সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই। আগে বের করতে হবে ঘাটতির প্রকৃত কারণ, ঠিক করতে হবে বৈধতা, বাদ দিতে হবে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়। এরপর যদি বাস্তবেই ঘাটতি থাকে, তবেই শুধু মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।’
বাড়ছে উৎপাদন খরচ ও ভর্তুকি
পিডিবির তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ছিল ২.১৩ টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৩.১৬ টাকা। এরপর ২০২২ সালে হয় সাড়ে ৮ টাকার মতো। বর্তমানে সেই খরচ বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৩ টাকা। প্রতি ইউনিটে ঘাটতি ৬ টাকার কাছাকাছি।
এদিকে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারের ভর্তুকি বেড়েই চলেছে। সেই চাপ সামলাতে আওয়ামী লীগ সরকার বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহী আদেশে দফায় দফায় বাড়িয়েছে বিদ্যুতের দাম।
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে মোট বরাদ্দ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে ৩২ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। হাতে রয়েছে মাত্র তিন হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। এর বাইরে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হবে ১৫ হাজার ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ ৬৫ হাজার ৫৫৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা হতে পারে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর মধ্যে সম্প্রতি তরল জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিজনিত অতিরিক্ত ঘাটতি ধরা হয়েছে ১১ হাজার ২৬৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। রিজার্ভ মার্জিন ধরে রাখতে ২২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা হলেই চলে। অতিরিক্ত এসব কেন্দ্রে উৎপাদন না করলেও সরকারকে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
দাম বাড়ানোর বিরোধিতা ভোক্তাদের
গত ২০ ও ২১ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক নেতা, ভোক্তা অধিকারকর্মী, ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, ভুল পরিকল্পনা ও অপচয়ের বোঝা এখন সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপানো হচ্ছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স মনে করেন, শিল্প ও রপ্তানি খাত এমনিতেই নানা চাপে রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ালে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এর আগে গত ১৯ এপ্রিল ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই মাসে দুই দফায় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়েছে মোট ৫৯৯ টাকা। যদিও বাজারে এর চেয়ে বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। এ ছাড়া গত ১৮ এপ্রিল দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার।
শিল্প ও রপ্তানি খাত এমনিতেই নানা চাপে রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ালে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
সে সময় অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রলের দাম লিটারপ্রতি ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। আর কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়। মে মাসে দাম অপরিবর্তিত থাকলেও চলতি মাসে ডিজেল বাদে অন্যান্য জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়লে মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে। রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলছিলেন, ‘যেভাবে সবকিছুর দাম বাড়ছে সে অনুযায়ী বেতন তো বাড়ছে না। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চলবে কীভাবে?’ ‘মানলাম সরকার না হয় বাধ্য হয়ে দাম বাড়াচ্ছে। কিন্তু যাদের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এই ব্যয় বাড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে তো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সব দায় কী সাধারণ মানুষের?’ প্রশ্ন তোলেন তিনি।




