সাক্ষাৎকার
ইপিএ কার্যকর হলে বাণিজ্য বাড়বে ৯ বিলিয়ন

রবিউল আলম
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে অবকাঠামো, জ্বালানি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মেট্রোরেলের নতুন লাইন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ইপিএ বাস্তবায়ন গুরুত্ব পেতে পারে। এমনটি আগামীর সময়কে জানিয়েছেন জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) মহাসচিব রবিউল আলম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি ইব্রাহিম হোসাইন রেজোয়ান
আগামীর সময়: প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কতটা?
রবিউল আলম: আমরা সফরটি নিয়ে আশাবাদী। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ জাপানে যাচ্ছে। অবকাঠামো, জ্বালানি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাতে এসব প্রস্তাব রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে জাপান বাংলাদেশকে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে। ফলে দেশটি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন-সহযোগী।
আগামীর সময়: সফরে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্ব পেতে পারে?
রবিউল আলম: মেট্রোরেলের নতুন দু-তিনটি লাইন এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে অন্যতম প্রধান বিষয় হবে বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ বাস্তবায়ন। গত ফেব্রুয়ারিতে দুদেশের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এখন সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এটি কার্যকর হবে। প্রধানমন্ত্রীর সফর এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে।
আগামীর সময়: ইপিএ কার্যকর হলে বাণিজ্যে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?
রবিউল আলম: বর্তমানে দুদেশের বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। জেবিসিসিআইয়ের দুই বছর আগের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইপিএ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে তা ১৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সুযোগ রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলায়ও এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু চুক্তি করলেই হবে না; রপ্তানি বাড়াতে পণ্যের মান, প্রয়োজনীয় সনদ ও উৎপাদন সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
আগামীর সময়: জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রধান বাধা কী?
রবিউল আলম: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বড় বাধা। করব্যবস্থার জটিলতা, বন্দর ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বল সরবরাহব্যবস্থাও বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। বিডা, বেজা ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ববিষয়ক সংস্থাকে একীভূত করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ গঠনের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে প্রতিষ্ঠান একীভূত করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরা কত দ্রুত সেবা পাচ্ছেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
জাপানি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করেন। তারা পাঁচ থেকে দশ বছরের স্থিতিশীল নীতি ও ব্যবসায়িক পরিবেশ চান। ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস ও ভারতের মতো বিকল্প দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করেই তারা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।
আগামীর সময়: রপ্তানি ও বিনিয়োগে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে?
রবিউল আলম: বাংলাদেশে বছরে গড়ে ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আসে। অন্যদিকে ভিয়েতনামে বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি বিনিয়োগ আসে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়। আমাদের রপ্তানিও তৈরি পোশাকনির্ভর। হালকা প্রকৌশল, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মৎস্যজাত পণ্যের মতো খাতে রপ্তানি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নতুন শিল্পে বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা জরুরি।
আগামীর সময়: জাপানের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর সুযোগ কতটা?
রবিউল আলম: সফটওয়্যার প্রকৌশলী, নার্স ও পরিচর্যাকারী পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। জাপানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিচর্যাকারী ও নার্সের চাহিদা রয়েছে। তবে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি জাপানি ভাষায় যোগাযোগের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। দেশে বসেই ভাষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও নেপালের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে দক্ষ কর্মী তৈরি করতে হবে। এতে কর্মীদের আয় ও দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন— দুটিই বাড়বে।
আগামীর সময়: আগামী পাঁচ বছরে দুদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে কোথায় দেখতে চান?
রবিউল আলম: ইপিএ কার্যকর করা, বিনিয়োগের বাধা দূর করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করতে পারলে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। এজন্য সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সবপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।



