পোশাকের জোরে রপ্তানিতে নতুন গতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্ব অর্থনীতির টানাপড়েন আর আন্তর্জাতিক বাজারের মন্দাভাব কাটিয়ে নতুন অর্থবছরে শুরুতেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের পণ্য রপ্তানি খাত। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাসেই তৈরি পোশাকের শক্তিশালী গতি এবং নতুন বাজারগুলোর সাড়ায় পণ্য রপ্তানিতে দেখা দিয়েছে চাঙ্গাভাব। সদ্যসমাপ্ত জুলাই মাসে দেশ থেকে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪৭২.৭৫ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের মাস জুনের (৪২০.২৭ কোটি ডলার) তুলনায় ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। সরকার নির্ধারিত প্রতি মাসের গড় রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২.৭৫ কোটি ডলার বেশি আয় অর্জিত হয়েছে অর্থবছরের প্রথম মাসেই। জুলাইয়ে বিগত ১২ মাসের (আগস্ট-জুলাই) মধ্যে সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় এসেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শুধু পণ্য রপ্তানি খাত থেকে ৫ হাজার ৫২০ কোটি ডলার আয়ের বাৎসরিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই হিসাবে প্রতি মাসে গড় লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪৬০ কোটি ডলার। জুলাইয়ের অর্জিত ৪৭২.৭৫ কোটি ডলারের আয় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। তবে বছরভিত্তিক হিসাবে গত বছরের একই মাসের তুলনায় চলতি বছরের রপ্তানি আয় শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে রপ্তানি আয় এসেছিল ৪৭৭.০৬ কোটি ডলার। মূলত গত বছরের জুলাইয়ে অর্জিত উঁচুমাত্রার রপ্তানি ভিত্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কভিড-পরবর্তী মজুদ পণ্যের সমন্বয়ের কারণেই বছরভিত্তিক এই সামান্য পার্থক্য তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বরাবরের মতোই পণ্য রপ্তানির এই সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি ছিল তৈরি পোশাক খাত। জুলাই মাসে পোশাক খাত থেকে আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৮৮.৬৭ কোটি ডলার, যা আগের মাস জুনের ৩৩৮.৭৭ কোটি ডলারের তুলনায় ১৪.৭৩ শতাংশ বেশি। তবে গত বছরের জুলাইয়ের চেয়ে রপ্তানি আয় কমেছে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ।
জুলাই মাসে নিটওয়্যার রপ্তানি থেকে এসেছে ২১৫.৯১ কোটি ডলার, যা জুন মাসের ১৮৪.০২ কোটি ডলারের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৭২.৭৭ কোটি ডলার, যা জুনের ১৫৪.৭৫ কোটি ডলারের তুলনায় ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
জুলাইয়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি হয়েছে ১৩.১০ কোটি ডলার, যা জুনের চেয়ে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি। তবে গত বছরের জুলাইয়ের চেয়ে ২ দশমিক ৮১ শতাংশ কম। পাট ও পাটজাত খাত অর্জিত করেছে ৮.৫৪ কোটি ডলার। জুনের চেয়ে কিছুটা কমলেও বছরভিত্তিক হিসাবে গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় এ খাতে ৫৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ বিশাল প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। শাকসবজি, চা, তামাক ও শুকনো খাবারসহ কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য থেকে জুলাইয়ে আয় এসেছে ৮.২৩ কোটি ডলার। অন্যদিকে হোম টেক্সটাইল খাতে আয় হয়েছে ৭.৭৯ কোটি ডলার, প্রকৌশল পণ্য থেকে অর্জিত হয়েছে ৬.৯১ কোটি ডলার এবং ওষুধ খাত থেকে এসেছে ২.২৭ কোটি ডলার।
আন্তর্জাতিক গন্তব্যের চিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ একক বাজার হিসেবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে ৯১.৮৭ কোটি ডলারের পণ্য, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি। ইউরোপীয় বাজারগুলোর মধ্যে ৪৯.৫৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জার্মানি এবং ৪৭.৮৪ কোটি ডলারের রপ্তানি নিয়ে তৃতীয় স্থানে বহাল রয়েছে যুক্তরাজ্য। অন্যদিকে আঞ্চলিক ও অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করেছে ভারত ও সৌদি আরব; জুলাই মাসে দেশ দুটিতে রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
সামনে শরৎ ও শীতকালীন আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে নতুন ক্রয়াদেশ আসার বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি, পোশাক খাতের জোরালো প্রত্যাবর্তন এবং অপ্রচলিত বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার কারণে প্রথম মাসের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় থাকলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাৎসরিক পণ্য রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা পুরোপুরি সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।






