ছোট প্রকল্পে লাগাম আসছে গুচ্ছ প্রকল্প
- চলতি অর্থবছর থেকেই কার্যকর

পাল্টে যাচ্ছে প্রকল্প নেওয়ার ধরন। একক থেকে গুচ্ছে যাচ্ছে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। অর্থাৎ যেকোনো খাতে এককভাবে একাধিক প্রকল্প গ্রহণের পরিবর্তে সমজাতীয় প্রকল্পগুলোকে এক একটি কর্মসূচির আওতায় গুচ্ছাকারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সেই সঙ্গে চলমান প্রকল্প এবং অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে রিস্কোপিং (কাজের পরিধি বা ব্যাপ্তি ছোট বা পুনর্বিন্যাস করা) ও রিপারপাসিংয়ের (বরাদ্দের খাত বদলে অন্য প্রয়োজনীয় খাতে অর্থ ব্যবহার করা) গাইডলাইন জারি করেছে পরিকল্পনা বিভাগ। এতে মন্ত্রণালয়গুলোকে উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে আটটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই নতুন পদ্ধতি কার্যকর করা হচ্ছে। গত ৪ আগস্ট এই গাইডলাইন জারি করা হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি আগামীর সময়কে বলেছেন, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকল্প থাকলে অনেক সমস্যা হয়। অনেক সময় দেখা যায় অর্থ ও সময়ের অপচয় হতে পারে। কিন্তু সমন্বিত গুচ্ছ কর্মসূচি হলে সেটির চিন্তাভাবনাও সমন্বিত হবে। মনিটরিংও সুবিধা হবে। পাশাপাশি একটি ছাতার মতো বড় কর্মসূচির নিচে থাকলে প্রকল্পের বাস্তবায়নেও গতি থাকবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, নতুন পরিবর্তনের কোনো জটিলতা হবে না। আমরা সেভাবেই সাজাচ্ছি।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ আগামীর সময়কে বলেছেন, উদ্দেশ্য চমৎকার, কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন হবে। আইডিয়াটা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে খুব ভালো হবে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, যেখানে একটি ছোট প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়ে নানা জটিলতা থাকে, সেখানে এতবড় কর্মসূচির ক্ষেত্রে কী হবে। এ ছাড়া সব প্রকল্পের বিষয় এক হলেও গুরুত্ব এক নাও হতে পারে। যেমন পদ্মা আর তিস্তা ব্যারাজের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাজনিত ইস্যু এক হবে না। এখন যদি দেশের সব ব্যারাজকে এক করে দেখা হয়, তাহলে সেটি কতটা যৌক্তিক হবে বলে প্রশ্ন তোলেন সরকারের সাবেক এই সচিব।
পরিকল্পনা বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত চলমান প্রকল্প এবং সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্ত অননুমোদিত নতুন প্রকল্প রিস্কোপিং ও রিপারপাসিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়, বিভাগগুলো গাইডলাইনের পদক্ষেপগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করবে। মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলো তাদের আওতায় চলমান প্রকল্পগুলোর এবং সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্ত অননুমোদিত নতুন প্রকল্পগুলো বা ততোধিক কর্মসূচির আওতায় বিভক্ত করবে এবং সমজাতীয় প্রকল্পগুলোকে এক একটি কর্মসূচির আওতায় গুচ্ছাকারে অন্তর্ভুক্ত করবে। এ ছাড়া চলমান প্রকল্পগুলো বিশদভাবে পর্যালোচনা করে নির্বাচনী ইশতেহার এবং সরকারের হালনাগাদ উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়— এমন অসমাপ্ত অংশ প্রকল্প থেকে বাদ দেবে। এর মধ্যে অনুমোদিত একটি প্রকল্পের মধ্যে চলমান অন্য যেকোনো প্রকল্পের সমজাতীয় কাজ যুক্ত করবে। পাশাপাশি অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় (সবুজ পাতায়) অন্তর্ভুক্ত এক বা একাধিক প্রকল্প প্রস্তাব থেকে বর্তমান সরকারের ইশতেহার এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমজাতীয় কাজ এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ সমজাতীয় অন্য যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ অন্তর্ভুক্ত করে প্রকল্পটির ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) সংশোধনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তৈরি করবে।
এক্ষেত্রে উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের ক্ষেত্রে বলা যায়, সারা দেশে বাঁধ সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ, পুরো দেশের খাল খনন, ব্যারাজ নির্মাণ এবং পোল্ডার পুনর্বাসনের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। উপরোক্ত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে গুচ্ছভাবে কর্মসূচি তৈরি করতে হবে। যেমন: প্রথমত সারা দেশের ‘বাঁধ সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ’ কর্মসূচির আওতায় গ্রহণ করা সব প্রকল্প গুচ্ছাকারে নেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে কর্মসূচির নাম হতে পারে ‘সারা দেশের সব বাঁধ পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার’। দ্বিতীয়ত, সব খাল খননের প্রকল্প ‘সমগ্র বাংলাদেশের খাল খনন কর্মসূচি’ এই কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, সব ব্যারাজ নির্মাণের প্রকল্প ‘ব্যারাজ নির্মাণ’ কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
জানা গেছে, প্রস্তাবিত সংশোধিত প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং শিরোনাম নতুনভাবে নির্ধারণের প্রয়োজন হলে তা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। এ ছাড়া ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) নেতৃত্বে গঠিত এ-সংক্রান্ত কমিটি প্রাপ্ত সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবনাগুলো পর্যালোচনা করে পর্যবেক্ষণগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগকে অবহিত করবে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রণীতব্য আরএডিপির মোট প্রকল্প সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা হবে। এ কমিটির পর্যবেক্ষণের আলোকে মন্ত্রণালয় বা বিভাগ তাদের সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবনাগুলো আরডিপিপির (সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব) নির্ধারিত ছকে প্রকল্প সংশোধনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সেক্টর বিভাগে পাঠাবে। ওপরের সব প্রক্রিয়া সম্পাদনের ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়— এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাবে না। উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির কোনো বিষয় পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে তাদের সম্মতি নিতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো বিষয় পরিবর্তনের ব্যাপারে তারা সম্মত না হলে সে বিষয়গুলোকে অপরিবর্তিত রাখতে হবে। এ ছাড়া নির্বাচনী ইশতেহার বা উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেসব কাজ বিদ্যমান কোনো প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে না, সেসব কাজের সমন্বয়ে প্রণীত প্রকল্প প্রস্তাব সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্তির জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে হবে।




