এলডিসি উত্তরণে ৩ বছরের বাড়তি সুযোগ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সমন্বয়ের তাগিদ

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন সিপিডির ফেলো ও সিটিজেনস প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ছবি : আগামীর সময়
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে জাতিসংঘ। তবে এই বাড়তি সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও নীতিগত সংস্কারের তাগিদ।
এই তিন বছরকে শুধু অতিরিক্ত সময় হিসেবে না দেখে অর্থনীতি পুনর্গঠন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
এলডিসি উত্তরণের ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ বা এসটিএসের সমন্বয় কাজ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে সরিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
আজ রবিবার সিপিডি কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ: জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক বিশেষ মিডিয়া সংলাপে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির ফেলো ও সিটিজেনস প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বাংলাদেশ ২০১৮, ২০২১ ও ২০২৪ সালের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় এলডিসি উত্তরণের তিনটি মূল মাপকাঠিতেই উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে উত্তীর্ণ হয়েছে।
‘এই তিনটি সূচক হলো মাথাপিছু জাতীয় আয় বা জিএনআই, মানব সম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক’, বলছিলেন দেবপ্রিয়।
২০২৪ সালের হিসাবে মাথাপিছু জিএনআই নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে ১০৬ শতাংশ বেশি ছিল। মানব সম্পদ সূচক ছিল ১৭ শতাংশ বেশি। আর অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশ ৩২ শতাংশ ভালো অবস্থানে ছিল।
তার ভাষ্য, এখন মূল প্রশ্ন আর এলডিসি উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন নয়। বরং চূড়ান্ত উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং সেই অগ্রগতি টেকসই করা।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের রেজুলেশনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক রূপান্তরের জটিলতা ও বিশেষ পরিস্থিতির বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে।
সংলাপে বলা হয়েছে, এসব পরিস্থিতি অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলা এবং সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতাকে সংকুচিত করেছিল।
এলডিসি উত্তরণের ইতিহাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অর্থনৈতিক সংকটের বাইরে রাজনৈতিক রূপান্তরকে ভিত্তি করে সময় বাড়ানোর ঘটনা এটিই প্রথম। তবে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কমিটি স্পষ্ট করেছে, এটি নিয়মের একটি বৃহত্তর ব্যাখ্যা মাত্র। ভবিষ্যতে আর কোনো মেয়াদ বাড়ানো হবে না।
সাধারণ পরিষদে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে এই সময়কে সংস্কারের অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করার তাগিদও দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ এবং রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
উপস্থাপনায় বলা হয়, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ৩২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে। রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেন দেবপ্রিয়।
এ ছাড়া লজিস্টিকস ও জ্বালানি খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন চুক্তি ও আলোচনা চলমান রয়েছে। তবে এলডিসি উত্তরণের পর এসব সুবিধা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক টেকসই রাখতে অভ্যন্তরীণ সংস্কার জোরদার করতে হবে বলে মত দেওয়া হয়।
সিপিডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সরকারের প্রকাশিত প্রেস নোটে সিদ্ধান্তটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেখানে সিদ্ধান্তের ‘ব্যতিক্রমী ভিত্তি’ এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কার অর্জনের শর্তের বিষয়টি বাদ পড়েছে।
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি আরও কার্যকর করতে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি এসটিএস বা স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির সমন্বয় কাজ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে সরিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ন্যস্ত করার পরামর্শ দেন।
পাশাপাশি সভায় একটি পাবলিক এসটিএস ড্যাশবোর্ড চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে উত্তরণের রোডম্যাপ উপস্থাপনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া রপ্তানি নগদ সহায়তার মতো এলডিসি-নির্দিষ্ট সুবিধাগুলো ২০২৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের ভাষ্য, এই তিন বছরের বাড়তি সময় শুধু সময় পার করার সুযোগ নয়। বরং অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং বড় ধরনের নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য এটি বাংলাদেশের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।



