ঢাকা সফরে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা
- শীর্ষস্থানীয় ২৫ প্রতিষ্ঠানের ৪৫ প্রতিনিধি আসছেন আজ

ফাইল ছবি
বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন এক অধ্যায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কৌশলগত কারণে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট জায়ান্টদের চোখ এখন ঢাকার দিকে। ২৫টি শীর্ষস্থানীয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৫ প্রতিনিধি বাংলাদেশ সফরে আসছেন আজ। এই ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের সফর বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারি আরও গভীর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হবে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশে সঞ্চিত বা পুঞ্জীভূত বৈশ্বিক বিনিয়োগের বিচারে যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই প্রথম সারিতে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে তাদের পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের স্থিতি ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের বেশি। আর প্রতি বছর নিট মূলধন আসার পরিমাণ ১৫০-৩০০ মিলিয়ন ডলারের ঘরে ওঠানামা করে। তবে এই বিনিয়োগের সিংহভাগই শুধু নতুন নগদ টাকা হিসাবে আসছে না; মেটলাইফ, সিটিব্যাংক কিংবা শেভরনের মতো বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করা আন্তর্জাতিক জায়ান্টরা এখানে যে মুনাফা অর্জন করছে, তার বড় একটি অংশ তারা নিজ দেশে না পাঠিয়ে বাংলাদেশের বাজারেই পুনর্বিনিয়োগ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বলতেই চোখের সামনে ভাসে দেশের গ্যাসক্ষেত্র বা জ্বালানি খাতের ছবি। মূলত বাংলাদেশের গ্যাস উত্তোলন এবং মোট বিদ্যুৎ চাহিদার বড় একটি অংশ জোগান দেওয়ার পেছনে আমেরিকান মূলধনের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগের ক্যানভাস কিছুটা বদলেছে। ব্যাংক ও বীমা সেবার আধুনিকায়নে সিটিব্যাংক ও মেটলাইফের ভূমিকা যেমন স্থায়ী রূপ নিয়েছে, তেমনি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ডেটা প্রসেসিং, ডিজিটাল লজিস্টিকস ও সফটওয়্যার খাতের মতো উদীয়মান আইটি সেক্টরে যুক্তরাষ্ট্রের তহবিলের উপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (আমচ্যাম) সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের কয়েকটি বিশেষ ও উদীয়মান খাতের দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি জায়ান্টদের বড় ধরনের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের অফশোর তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে। সরকার সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে ২৬টি অফশোর ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে, যেখানে ব্রেন্ট-লিংকড গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, পূর্ণ মুনাফা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সুযোগ এবং কর ছাড়ের মতো আকর্ষণীয় সুবিধা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে দেশের ফিনটেক ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও বিদেশি বিনিয়োগের বড় সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ভিসাপ্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন, পেমেন্ট গেটওয়েতে পেপাল ও বাধ্যতামূলক ‘বাংলা কিউআর’ সুবিধা চালুর উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের পে-টেক কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে কাজ করার পথ সুগম করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের মূলধনের প্রবাহ বাড়াতে গেলে কিছু কাঠামোগত বাধা ও ব্যবসায়িক দাবির সম্মুখীন হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিশেষ করে গ্যাস খাতের বকেয়া বিল পরিশোধের অনিশ্চয়তা এবং অর্জিত লভ্যাংশ বা মুনাফা সহজে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জটিলতা দূর করার দাবি দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি বন্দরের কাস্টমস ব্যবস্থার লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমানো, মেধা স্বত্বাধিকার সংরক্ষণ আইন শক্তভাবে প্রয়োগ করা এবং শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে আসার ওপর জোর দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেছেন, ‘শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, যেকোনো দেশের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগকেই আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে রয়েছে; আমাদের এফডিআই এখনো জিডিপির ১ শতাংশের নিচে। সে প্রেক্ষাপটে মার্কিন মূলধনকে স্বাগত জানানো হলেও বিনিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া অবশ্যই স্বচ্ছ হতে হবে এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন নীতি বজায় রাখতে হবে।’




