কপোতাক্ষের বাঁধে ফাটল, তিন দিন ধরে পাহারায় গ্রামবাসী

তালা উপজেলার বালিয়া গ্রামে কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধে ফাটল। ছবি: আগামীর সময়
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বালিয়া গ্রামে কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধে একাধিক ফাটল দেখা দেওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ। জোয়ারের চাপ বাড়লে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে লোনা পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কায় তিন দিন ধরে পালা করে বাঁধ পাহারা দিচ্ছেন তারা। মাটি ও বালু দিয়ে নিজেদের উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ মেরামতের চেষ্টা করলেও এখনো সরকারি কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
খেশরা ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গত শনিবার রাতে জোয়ারের তীব্র চাপে বেড়িবাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়। বিলের মাছের ঘেরে থাকা কয়েকজন প্রথমে বিষয়টি দেখতে পান। পরে তারা গ্রামে গিয়ে মসজিদের মাইকে খবর দিলে লোকজন ঝুড়ি, কোদাল ও মাটি নিয়ে নদের পাড়ে ছুটে যান।
রাতেই গ্রামবাসী সম্মিলিতভাবে ভাঙা অংশে মাটি ফেলে পানি আটকাতে সক্ষম হন। এতে সেদিন লোকালয়ে পানি ঢোকেনি। তবে পরে বাঁধের আরও কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁধের অন্তত দুটি স্থানে ফাটল দিয়ে পানি চুঁইয়ে ভেতরের দিকে ঢুকছে। স্থানীয়রা মাটি ফেলে ফাটলগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করছেন। কেউ কোদাল দিয়ে মাটি কাটছেন, আবার কেউ ঝুড়িতে করে মাটি নিয়ে যাচ্ছেন। রাতেও কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে বাঁধ পাহারা দিচ্ছেন তারা।
বালিয়া গ্রামের নাজমিন আক্তার জানিয়েছেন, শনিবার রাতে দ্রুত সবাই এগিয়ে না এলে গ্রামের ঘরবাড়ি ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে যেত। নতুন করে ফাটল দেখা দেওয়ার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিন দিনেও কেউ পরিস্থিতি দেখতে আসেননি।
তিনি বলেছেন, বাঁধ ভেঙে গেলে শুধু বালিয়া নয়, পাশের শুভংকরকাঠি, তেঘরিয়া ও শ্রীমন্তকাঠি গ্রামের বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তলিয়ে যেতে পারে মাছের ঘের ও কৃষিজমি। এতে কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান গাজী ও জামাল উদ্দীন জানান, প্রায় ১২ থেকে ১৩ বছর আগে কপোতাক্ষ নদ খননের সময় এলাকাবাসী সিএস ম্যাপ অনুসরণ করার দাবি জানিয়েছিলেন। প্রথম দিকে ম্যাপ অনুযায়ী কাজ হলেও পরে তা অনুসরণ না করায় নদের গতিপথ জনবসতির কাছাকাছি চলে আসে।
এতে বালিয়া অংশে নদ অনেক গভীর হয়ে যায় এবং স্রোতের চাপও বেড়ে যায়। একই সময়ে এলাকায় টিআরএম কার্যক্রম চালু হওয়ায় স্রোত আরও তীব্র হয়। অথচ এ অংশে স্থায়ী ও টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি বলেও জানান তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় প্রতিবছর টিআরএম সংযোগ খালের আশপাশের দুটি স্থানে জোয়ারের চাপে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ঘের, ফসলি জমি ও বসতবাড়ি ক্ষতির মুখে পড়ে। স্থায়ী সমাধানের দাবিতে একাধিকবার লিখিত আবেদন, সভা ও মানববন্ধন করা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
খেশরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম লাল্টু জানিয়েছেন, বালিয়া এলাকার বাঁধের কয়েকটি স্থান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন করে ফাটল দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়েছে।
তিনি করেছেন, বাঁধ ভেঙে গেলে বিস্তীর্ণ এলাকা লোনা পানিতে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত বাঁধ মেরামতের পাশাপাশি কপোতাক্ষ নদের বালিয়া অংশ সিএস ম্যাপ অনুযায়ী খনন এবং স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া জানিয়েছেন, বালিয়া এলাকার বাঁধের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি অবগত। আগেও তিনি ওই এলাকা পরিদর্শন করেছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুরোধে সেখানে কাজের প্রাথমিক অনুমতি পাওয়া গেলেও পরে তা বাতিল করা হয়। এখন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সারা দেশে জরুরি কাজ বন্ধ রয়েছে। নতুন করে বরাদ্দ ও অনুমোদন পাওয়া গেলে বালিয়া এলাকার বাঁধে প্রয়োজনীয় কাজ করা হবে।




