‘আলু রে, তুই মোক ফকির বানে গেলু’

ছবি: আগামীর সময়
‘আলু রে তুই মোক ফকির বানে গেলু। এত কষ্টের আবাদের আলু তুই পচি গেলু! তোক ফ্যালে দিতে বুকখান মোর ফাটি যায় চোল রে আলু।’
বাড়িতে সংরক্ষণ করা বস্তার আলু পচে নষ্ট হওয়ায় সড়কের পাশে ফেলছিলেন রংপুরের গঙ্গাচড়ার কুড়িয়ার মোড় এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান। এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবে কষ্টের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তিনি।
শুধু মিজানুরই নন, এলাকায় দুই শতাধিক কৃষকের সংরক্ষিত আলু এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি টানা বর্ষণসহ বৈরী আবহাওয়ায় পচে গেছে ঘরে রাখা আলু। তারা বস্তাসহ পচা আলু ফেলে দিচ্ছেন বাধ্য হয়েই।
সরেজমিন সোমবার কুড়িয়ার মোড় এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শত শত বস্তাভর্তি পচা আলু ফেলে রাখা হয়েছে সড়কের পাশে। কোথাও কোথাও স্তূপ করা এসব আলু থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, দাম পড়ে যাওয়ায় আলু বিক্রি সম্ভব হয়নি। হিমাগারে জায়গা না পেয়ে সংরক্ষণ করেছিলেন বাড়িতে। বৈরী আবহাওয়ায় বস্তার আলু পচে যাওয়ায় ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
৮০ বস্তা আলু পচে নিঃস্ব হওয়া কৃষক মিজানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘জমি লিজ, সার, বীজ, কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, পরিচর্যাসহ এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১৮ টাকা। পাইকাররা সেই আলুর দাম বললেন মাত্র ৫ টাকা। হিমাগারে রাখলে খরচ আরও বাড়ে। বাড়িতে যত্নে রেখেও সর্বস্বান্ত হতে হলো।’
চেংমারী গ্রামের কৃষক চান মিয়া নিজেরসহ লিজ নেওয়া প্রায় ৩ একর জমিতে আলু চাষ করেছেন। তিনি জানালেন, ফলন ভালো হলেও উত্তোলনের সময় ক্রেতা না পাওয়ায় কিছু আলু হিমাগারে রাখেন এবং ২০০ বস্তা সংরক্ষণ করেন বাড়িতে; কিন্তু বাড়িতে রাখা আলুতে পচন ধরেছে।
স্থানীয় কৃষি অফিস জানায়, চলতি বছর উপজেলায় আলু চাষ হয়েছে ৫ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ২০৭ টন। তবে এ বছর আগাম বৃষ্টিতে প্রায় ৬০ হেক্টর জমির আলু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিরিক্ত উৎপাদনে বাজার ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য না থাকায় দাম গেছে কমে। বর্তমানে পাইকারি বাজারে দর ৬ থেকে ৭ টাকা কেজি হলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকের কাছ থেকে কেনা হচ্ছে ৪ থেকে ৫ টাকায়। প্রতি কেজি আলুতে ১৩ থেকে ১৪ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
উপজেলার একমাত্র হিমাগারের ধারণক্ষমতা প্রায় দেড় লাখ বস্তা, যা এরই মধ্যে পূর্ণ হয়েছে, নতুন করে আলু রাখার জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক আলু সংরক্ষণ করেছেন বাড়িতে; কিন্তু বৈরী আবহাওয়ায় আলু দ্রুত পচে যাচ্ছে।
গঙ্গাচড়া এমএনটি হিমাগারের সামনে নবনী দাস এলাকার আলু ব্যবসায়ী মানিক মিয়া আক্ষেপ করেন, ‘মাঠে ৫ টাকা কেজিতে আলু কিনলেও বস্তা, শ্রমিক, পরিবহন খরচ ও হিমাগার ভাড়াসহ প্রতি কেজিতে খরচ পড়ে প্রায় ২০ টাকা। অথচ বাজারে দাম ৬ থেকে ৭ টাকা। আগের কেনা আলুই এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
এদিকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর ও দিনাজপুর আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর বিভাগের আট জেলায় আলুর আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৯৬ হেক্টরে। উৎপাদন হয়েছে ৫১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৪৯ টন। অথচ রংপুর বিভাগে ১১৫টি হিমাগারের ধারণক্ষমতা মাত্র ১১ লাখ ২৯ হাজার ৩৫ টন।
উৎপাদিত এই বিপুল পরিমাণ আলুর তিন ভাগের এক ভাগও সংরক্ষণের সুযোগ মেলেনি। বাধ্য হয়ে লোকসানে বিক্রি করেছেন কৃষকরা। অল্প সময়ে দাম পাওয়ার আশায় কেউ কেউ বাড়িতে সংরক্ষণ করলেও তা পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কৃষকরা অভিযোগ করেন, প্রতিবছর ধান আবাদ করে লাভ করা তো দূরের কথা, দায় হয়ে পড়ে আসল তোলা। গত পাঁচ বছরে প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে। অথচ প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে ধান আবাদের উপকরণের মূল্য। তাই অর্থকরী ফসল হিসেবে আলু আবাদ করে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন কৃষকরা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। বিষয়গুলো চিন্তা করে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি দাবি তাদের।





