স্বাদ ও পুষ্টিতে অনন্য, তবুও অবহেলায় গাছেই নষ্ট হচ্ছে দেশি খেজুর

ছবি: আগামীর সময়
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা, জিরাট, কার্পাসডাঙ্গা, জয়নগর, হাউলী ও নাস্তিপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের মেঠোপথের ধারে এখন চোখ জুড়ানো দৃশ্য। সারি সারি খেজুর গাছে ঝুলছে থোকায় থোকায় দেশি খেজুর। কোনোটি কাঁচা সবুজ, কোনোটি আবার পেকে লালচে-কালো রূপ ধারণ করেছে। একসময় এই পাকা খেজুরকে ঘিরে গ্রামীণ জনপদে উৎসবের আমেজ তৈরি হলেও, আজ যেন সেই চেনা দৃশ্যে বড় বেশি ভাটা পড়েছে। স্বাদ ও পুষ্টিগুণে ঠাসা থাকা সত্ত্বেও গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই মৌসুমি ফলটির প্রতি এখন আর কারো তেমন আগ্রহ নেই। ফলে অধিকাংশ গাছের ফল পেকে গাছেই নষ্ট হচ্ছে, কিছু ঝরে পড়ছে মাটিতে আর বাকিটা পরিণত হচ্ছে পাখির খাদ্যে।
স্থানীয় প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দশক আগেও জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই শিশু-কিশোরদের মধ্যে এক অন্যরকম আনন্দ মেতে উঠত। দল বেঁধে গাছে উঠে কিংবা লাঠি দিয়ে খেজুর পেড়ে খাওয়ার ধুম পড়ত। পরিবার ও প্রতিবেশীদের মাঝে খেজুর ভাগাভাগি করে খাওয়ার সেই আনন্দ ছিল অমলিন। কিন্তু আজ আর সেই দিন নেই। দামুড়হুদা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান বললেন, 'সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও বড় ধরনের বদল এসেছে। বাজারে এখন হরেক রকমের বিদেশি ফল সহজে পাওয়া যায়। এই আধুনিক খাদ্যাভ্যাস ও বিদেশি ফলের ভিড়ে আমাদের চিরচেনা দেশি ফলের প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।'
উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, গাছে গাছে খেজুরের কাঁধি ঝুললেও তা পাড়ার লোকের বড় অভাব। জয়নগর গ্রামের মাওলানা বনি-আমিনের আক্ষেপ, 'বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিশু-কিশোর তো দেশি খেজুরের স্বাদই চেনে না! আগে যে ফলের জন্য গাছের নিচে ভিড় জমতো, এখন সেই ফল দিনের পর দিন গাছেই ঝুলে থাকে, কেউ ফিরেও তাকায় না।' কার্পাসডাঙ্গার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার জানান, আগে এই মৌসুমে মাঠের গাছ থেকে পাকা খেজুর সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে বাড়তি কিছু আয় হতো। এখন বাজারে দেশি খেজুরের কোনো চাহিদাই নেই। তাই এখন শীতকালে খেজুরের গুড় বিক্রি করাই তাঁদের প্রধান ভরসা।
অথচ অবহেলিত এই ফলের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিমুক্ততা যেকোনো বিদেশি ফলের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কৃষিবিদ আরাফাত হোসেন জানান, দেশি খেজুর অত্যন্ত পুষ্টিকর ও নিরাপদ একটি ফল। এতে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক শর্করা, খাদ্যআঁশ, প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই খেজুর গাছ বেড়ে উঠতে বা ফলন দিতে কোনো ধরনের রাসায়নিক সার কিংবা কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত একটি শতভাগ নিরাপদ ফল।
দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জানালেন, 'দেশি খেজুর শুধু একটি ফল নয়, এটি আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষের অসচেতনতা ও আগ্রহের অভাবে আজ এই বিপুল পরিমাণ ফল অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবে আমরা যদি এই ফলটি সঠিকভাবে গাছ থেকে সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং আধুনিক উপায়ে বাজারজাত করতে পারি, তবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর একটি বড় বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।'




