বগুড়ার এক কলেজে তিন কমিটি, অধ্যক্ষ-সভাপতি পদ নিয়ে বিরোধ
- কমিটি নিয়ে টানাপড়েনে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান
- কমিটি ও নিয়োগ নিয়ে বিরোধ গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার দুর্গাহাটা ডিগ্রি কলেজে অধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডির সভাপতি পদ নিয়ে বিরোধ যেন কাটছেই না। একই সঙ্গে একাধিক ব্যক্তি নিজেদের বৈধ অধ্যক্ষ ও সভাপতি দাবি করায় কমিটি গঠন ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। প্রায় দুই বছর ধরে চলা এ বিরোধে ব্যাহত হচ্ছে কলেজের স্বাভাবিক পাঠদান, ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। দ্রুত এ সংকটের সমাধান করে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, জমিদাতা ও শিক্ষকরা।
গত ৯ অক্টোবর স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয় কলেজটির নিয়োগসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি। এর প্রতিবাদে আরেকটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর কলেজের কমিটি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কলেজটির অধ্যক্ষ ছিলেন মোজাফফর হোসেন নামে এক ব্যক্তি। নানা অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট পদত্যাগ করেন তিনি। এরপর দায়িত্ব নেন ময়নুল আহসান। তবে তিনি নিয়মিত কলেজে আসতেন না বলে জানা গেছে। পরে তার অনুপস্থিতিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শিক্ষকদের সুপারিশে দায়িত্ব দেওয়া হয় জিয়াউল ইসলাম জুয়েলকে।
বর্তমানে নিজেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দাবি করলেও নানা জটিলতার কারণে ছয় মাস ধরে কলেজে যাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন ময়নুল আহসান।
অন্যদিকে, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা জিয়াউল ইসলাম জুয়েল জানালেন, ময়নুল আহসান কলেজে অনুপস্থিত থাকায় দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পরিশোধসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হচ্ছিল। এ কারণে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে।
অধ্যক্ষ পদের পাশাপাশি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতির পদ নিয়েও চলছে বিরোধ। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তৎকালীন সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন লিটনকে বাদ দিয়ে সভাপতি করা হয়েছিল আকিল আহম্মেদ মমিনকে। পরে চলতি বছরের ১১ মে রবিউল আলম অশ্রুকে সভাপতি এবং আকিল আহম্মেদকে সদস্য মনোনয়নের জন্য আধা সরকারি পত্র (ডিও) দেন বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনের সংসদ সদস্য মোর্শেদ মিল্টন।
তবে শাহজালাল মানিক নামে আরেক ব্যক্তি নিজেকে সংসদ সদস্যের ডিও পাওয়া বৈধ সভাপতি বলে দাবি করছেন। যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো চিঠি দেখাতে পারেননি তিনি।
কমিটি গঠন ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন এসব কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। সভাপতি পদে দাবিদার আকিল আহম্মেদ মমিনের ভাষ্য, হাইকোর্টে রিট করার পর আদালতের আদেশে দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি। পরে শাহজালাল মানিককে সভাপতি করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানতে পারেন তিনি।
আকিল আহম্মেদ জানালেন, বর্তমানে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ সভা করবেন এবং পত্রিকায় প্রতিবাদ জানাবেন। এলাকাবাসী ও অভিভাবকরা এ নিয়োগ মেনে নেবেন না বলেও দাবি তার।
এ বিষয়ে শাহজালাল মানিকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন। তবে পরে আর তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
১৯৮৮ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত দুর্গাহাটা ডিগ্রি কলেজটি ১৯৯১ সালে ডিগ্রি কলেজে উন্নীত হয়। বর্তমানে কলেজটিতে পড়াশোনা করছে প্রায় ৫৩৪ শিক্ষার্থী।
কমিটি নিয়ে বিরোধ ও প্রশাসনিক অচলাবস্থায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কলেজের জমিদাতা ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, ঘন ঘন কমিটি পরিবর্তন এবং রিট মামলার কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে কলেজের স্বাভাবিক পরিবেশ।
কলেজের জমিদাতা মো. আশরাফ আলী জানিয়েছেন, তারা চান কলেজটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হোক, উন্নত হোক এবং সব ক্ষেত্রে শান্তি ফিরে আসুক। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পড়াশোনার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
কলেজের শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন বলছিলেন, ‘স্বল্প খরচে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনা করে। লাগাতার অনিয়ম ও বিরোধের কারণে কলেজের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।’
বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানের অভিযোগ, দুর্গাহাটা ডিগ্রি কলেজে একটি কমিটির নিয়োগ কার্যক্রম এবং অন্যপক্ষের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা। জানালেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি গাবতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলবেন।
অ্যাডহক কমিটির নিয়োগ দেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলছিলেন, ‘এ ধরনের কমিটির কাজ শুধু দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা ও নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে তদন্তের ভিত্তিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



