বেতাগী পৌরসভার কর বাড়ে, সেবা কমে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরগুনার বেতাগী পৌরসভায় নাগরিক সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, বেহাল অভ্যন্তরীণ সড়কও। এর মধ্যে ২০২৬ সালে পৌরবাসীর হোল্ডিং ট্যাক্স কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। কারও বার্ষিক কর বেড়েছে সাত গুণ, কারও পাঁচ গুণের বেশি। সেবার মান না বাড়িয়ে করের এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ক্ষোভ তৈরি করেছে নাগরিকদের মধ্যে। বর্ধিত কর বাতিল ও পুনর্নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনেও নেমেছেন তারা। নাগরিক সুবিধা যেখানে সীমিত, সেখানে করের বোঝা এত বাড়ল কেন— প্রশ্ন তাদের।
পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. জাফর আলী খানের বার্ষিক পৌরকর ছিল ২৭০ টাকা। চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯০ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে তার কর বেড়েছে সাত গুণ।
১৯৯৯ সালের ১৮ মার্চ যাত্রা শুরু করা বেতাগী পৌরসভা ধাপে ধাপে তৃতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, মোট জনসংখ্যা ২২ হাজার ৮৪৯ জন। হোল্ডিংয়ের সংখ্যা ৩ হাজার ৫৮৭।
পৌরসভার রাজস্ব-সংক্রান্ত তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যক্তিগত কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ লাখ ৪৭ হাজার ৪ টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫০ টাকায়।
ব্যক্তিগত হোল্ডিংয়ের কর নির্ধারণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের লাইলী বেগমের বার্ষিক কর ৪ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার ২৬৩ টাকা করা হয়েছে। একই ওয়ার্ডের লাবনী আক্তারের কর ৯৪৪ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৩০৮ টাকা। মোস্তফা কামালের কর ৩ হাজার ১১৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার ৬৬৩ টাকা।
পৌরবাসীর অভিযোগ, কর নির্ধারণের সময় বাড়ির ধরন, আর্থিক সামর্থ্য ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়নি। তাদের দাবি, সব ওয়ার্ডে গণশুনানির আয়োজন করা হলেও সেখানে নাগরিকদের আপত্তি ও প্রস্তাব গুরুত্ব পায়নি।
কর বৃদ্ধির পাশাপাশি সড়কবাতির কর আরোপ নিয়েও আপত্তি রয়েছে পৌরবাসীর। তাদের অভিযোগ, পৌরসভার অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত সড়কবাতি নেই। অথচ এসব এলাকার বাড়িঘরের ওপরও সড়কবাতির কর আরোপ করা হয়েছে।
পৌরসভার কর আরোপ ও আদায় পদ্ধতি বিধিমালা, ২০১৩-এর ১৭ ধারায় ইমারত এবং ভূমির বার্ষিক মূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের বিধান রয়েছে। একই বিধিমালার ৩১ ধারার (গ) উপধারা অনুযায়ী, সড়কবাতির পয়েন্ট থেকে ৩০০ ফুটের বাইরে অবস্থিত কোনো ইমারতের ওপর বাতির রেট আরোপ করা যাবে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পৌরবাসীর প্রশ্ন, যেখানে সড়কবাতি নেই বা নির্ধারিত দূরত্বের মধ্যে বাতির ব্যবস্থা করা হয়নি, সেখানে কীভাবে এই কর আরোপ করা হলো?
এদিকে বর্ধিত হোল্ডিং ট্যাক্স প্রত্যাহার দাবিতে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, মতবিনিময় সভা, গণসংযোগ, স্মারকলিপি দেওয়াসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন নাগরিকরা। তাদের বক্তব্য, নাগরিক সেবার মান নিশ্চিত না করে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো গ্রহণযোগ্য নয়।
পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা লাবনী আক্তারের ভাষায়, ‘এমনিতেই সীমিত আয়ে আমাদের বেঁচে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। তার ওপর অতিরিক্ত পৌরকর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে। তার দাবি, সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে কর নির্ধারণ করতে হবে।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যবসায়ী সাইদ মল্লিক বললেন, ‘মানুষের আয় কম, অথচ পৌরকর বেড়েছে কয়েক গুণ। নাগরিক সুবিধার ঘাটতি রেখে এভাবে কর বাড়ানো অযৌক্তিক।’
উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মহসীন খান মনে করেন, যৌক্তিক কারণ ও যথাযথ প্রস্তুতির বিষয়টি স্পষ্ট না করে কর বাড়ানোয় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। করের পরিমাণ সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
কমিটির আরেক প্রতিনিধি অধ্যক্ষ মো. রফিকুল আমিনের ভাষ্য, সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় না নিয়ে কর বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত কর প্রত্যাহার না হলে নাগরিকদের নিয়ে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ার দিয়েছেন।
অবশ্য সিদ্ধান্ত আবার বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহ. সাদ্দাম হোসেন। তার ভাষ্য, নাগরিকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা তাদের লক্ষ্য নয়। পৌরবাসীর আর্থিক অবস্থা ও অসন্তোষের বিষয়টি তারা জানেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে বিধি অনুযায়ী যৌক্তিক সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
তবে কর পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া, গণশুনানিতে উত্থাপিত আপত্তি এবং সড়কবাতির কর আরোপের বিষয়গুলো কীভাবে পর্যালোচনা করা হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।



