ঢলে ভেসে যায় ঘর, মেলে না সহায়তা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যে ঘরটিতে স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকার কথা, সেই ঘরেরই ভাঙা এক কোণে পলিথিন বিছিয়ে রাত কাটছে আছিয়া বিবির। সেপ্টেম্বরের এক সকালে পাহাড়ি ঢলের স্রোত মুহূর্তেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় তার ঘরের চালসহ সবকিছু। প্রাণ বাঁচাতে প্রতিবেশীরা তাকে টেনে বের করেন। তিন দিন না খেয়ে থাকার পর কোনো রকমে ঘরে ফিরলেও এক মাস পেরিয়ে গেলেও কাটেনি দুর্ভোগ। মেলেনি সরকারি কোনো সহায়তাও।
আছিয়া বিবির ভাষ্য, সকাল ৮টার দিকে হঠাৎ ঢল এসে যা ছিল সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমাকে ঘরের ভেতর থেকে মানুষ টেনে বের করে বাঁচিয়েছে। এখন ভাঙা ঘরেই কোনো রকমে থাকছি। কয়েক দিন আগে চোরও ঢুকেছে। তার দাবি, নতুন করে ঘর তৈরির সামর্থ্য নেই। সরকারের কাছে একটু সাহায্য চাই, আশ্রয় চাই।
শুধু আছিয়া নন, স্থানীয় বাসিন্দাদের হিসাবে ওই এক দিনের ঢলেই চারাগাঁওয়ে শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঢলের সঙ্গে নেমে আসা পলিতে অনেক ভিটা কয়েক ফুট উঁচু হয়ে গেছে। কোথাও ঘর বালুর নিচে চাপা পড়েছে, কোথাও বসতভিটার সঙ্গে নষ্ট হয়েছে ফসলি জমি। দুর্যোগ কেটে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুর্ভোগ কমেনি।
তাহিরপুরের চারাগাঁওসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে চলতি বছর কয়েকবার পাহাড়ি ঢল নেমেছে। সেপ্টেম্বরের ঢলে ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হলেও এর আগেও ঢলের স্রোতে প্রাণহানি ও ঘরবাড়ি হারানোর ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় যুবক আল আমিনের ভাষ্য, ঢলের সঙ্গে আসা কাদা, মাটি ও বালু জমে তাদের বসতভিটা আগের চেয়ে তিন-চার ফুট উঁচু হয়ে গেছে। অনেক ঘরই এখন মাটির নিচে। তার মতে, নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি স্বাভাবিক পথে যেতে পারছে না। নদী খনন করে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করা গেলে বসতবাড়িতে ঢলের পানি আসা কমতে পারে।
তাহিরপুরের উজানে ভারতের পাহাড় কেটে চুনাপাথর ও কয়লা উত্তোলনের এলাকাগুলোতেই বালু-পলি নামার প্রবণতা বেশি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। পাহাড়ের ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বৃষ্টির সময় সেখানকার মাটি ও বালু পানির সঙ্গে নেমে এসে সীমান্তবর্তী নদী, খাল ও বসতিতে জমছে। এতে একদিকে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে অল্প সময়ের মধ্যে বড় ঢল নামছে।
বন্যা, ঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস পাওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও সীমান্তের পাহাড়ি ঢলের ক্ষেত্রে এমন কোনো কার্যকর সতর্কবার্তা পান না স্থানীয় মানুষ। ফলে ঢল নামার আগপর্যন্ত অনেকেই কিছু বুঝতে পারেন না। হঠাৎ স্রোত এসে পড়ায় নিরাপদে সরে যাওয়ার সময়ও মেলে না।
এর আগেও এই অঞ্চলে পাহাড়ি ঢল প্রাণ কেড়েছে। ২২ জুন তাহিরপুরে পাহাড়ি ঢলের স্রোতে বসতঘরসহ তলিয়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালের জুনে শাল্লায় সড়ক পার হওয়ার সময় দুই সন্তানসহ ঢলের স্রোতে ভেসে মারা যান দুর্লভ রানী। পরের বছর দোয়ারাবাজারে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ও দোকান বিলীন হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
ঢলে ক্ষয়ক্ষতি ও সহায়তার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান এ বিষয়ে তথ্য না থাকায় মন্তব্য করেননি।
তবে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সহায়তা দেওয়াই এ সমস্যার সমাধান নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, ‘পাহাড়ি ঢলের বিষয়টি আন্তঃসীমান্ত সমস্যা। ভারতের যেসব এলাকায় পাহাড় কেটে পাথর বা খনিজ উত্তোলন করা হচ্ছে, সেখানে মাটি আলগা হয়ে পড়ায় বৃষ্টির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাটি ও বালু নিচের দিকে নেমে আসে। এতে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে।’
ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম মনে করেন, ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রথমে পাহাড় কাটা বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি ভারতে কত বৃষ্টিপাত হচ্ছে, কত বৃষ্টিতে কী পরিমাণ ঢল নামতে পারে— এসব তথ্য দুই দেশের মধ্যে ভাগাভাগি করা প্রয়োজন। তথ্য বিশ্লেষণ করে সীমান্তবর্তী মানুষকে আগাম সতর্ক করতে পারলে আকস্মিক ঢলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।




