গুজবে রাজশাহীতে হঠাৎ 'জ্বালানি আতঙ্ক'

ছবি: আগামীর সময়
রাত তখন আটটার কিছুটা পেরিয়েছে। রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে একের পর এক মোটরসাইকেল এসে থামছে। কারও হাতে জারকিন, কেউ আবার মোটরসাইকেলের ট্যাংক একেবারে ভর্তি করে নিতে ব্যস্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে গুজব- রাজশাহীতে নাকি জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। আর সেই গুজবই মুহূর্তেই ছড়িয়ে দেয় আতঙ্ক। প্রয়োজন না থাকলেও অনেকেই ছুটে যান ফিলিং স্টেশনে। ফলে স্বাভাবিক সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও নগরীর বিভিন্ন পাম্পে তৈরি হয় দীর্ঘ সারি।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাতের এই চিত্র দেখে অনেকের কাছেই মনে হয়েছিল, জ্বালানি তেলের সংকট শুরু হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। পরিস্থিতি দেখে রাতেই জেলা প্রশাসন জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, রাজশাহীতে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। একই বার্তা দেয় ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতি।
তাদের দাবি, পর্যাপ্ত মজুদ ও স্বাভাবিক সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণেই এই অস্বাভাবিক ভিড়ের সৃষ্টি হয়েছে।
আজ বুধবারও নগরীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তারপরও কয়েকটি পাম্পে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। অনেকেই ট্যাংক ভর্তি করে নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত জ্বালানি সংরক্ষণের জন্য জারকিনে তেল সংগ্রহ করছেন।
নগরীর আফরিন ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজন মোটরসাইকেল চালক জানান, ফেসবুকে জ্বালানি তেলের সংকটের খবর এবং বিভিন্ন পাম্পে ভিড়ের ছবি দেখে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে তেল পাওয়া না-ও যেতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকেই আগেভাগে তেল কিনতে এসেছেন। তবে অনেকেই পরে বুঝতে পারেন, আতঙ্কের মূল কারণ ছিল গুজব।
তাদের ভাষ্য, পাম্পে ভিড় দেখে আরও মানুষ তেল কিনতে আসেন। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার প্রবণতায় পরিস্থিতি আরও অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মঙ্গলবার রাতেই জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রাজশাহীতে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কোনো ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কেনা বা মজুদ না করার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি কিনে বাজারের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখতে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বয়ে বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি বা মজুদদারির মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শহিদুল ইসলাম। এতে পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, পেট্রোল পাম্প মালিক ও ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নেন।
সভায় জেলা প্রশাসক বললেন, ‘জ্বালানি তেলের সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কেনা বা মজুদ করার প্রয়োজন নেই। গুজবে কান না দিয়ে সরকারি ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সঠিক তথ্য জেনে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।’
তিনি আরও জানালেন, অযৌক্তিকভাবে জ্বালানি তেল ক্রয় বা মজুদ করলে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়াবে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে এবং বাজারে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।
রাজশাহী ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির সভাপতি মমিনুল হক বললেন, ‘মঙ্গলবার রাত আটটার পর হঠাৎ করেই বিভিন্ন পাম্পে গ্রাহকের চাপ বেড়ে যায়। তবে রাজশাহীতে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। পর্যাপ্ত পরিমাণে জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে এবং মঙ্গলবারও বিভিন্ন পাম্পে নতুন ট্যাংকারে তেল সরবরাহ করা হয়েছে।’
তাই আতঙ্কিত হয়ে তেল মজুত করে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরী না করতে তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
সভা শেষে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবারও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়- গুজব নয়, সঠিক তথ্য জানুন। গুজবে বিভ্রান্ত হবেন না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কিনবেন না বা মজুদ করবেন না।





