নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে অবদান, পাবনায় কৃষক-প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা

পাবনায় চারজন কৃষক ও ৪টি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে ‘প্রাকৃতিক কৃষি সম্মাননা’। ছবি: আগামীর সময়
রাসায়নিকের বিষাক্ত চক্র থেকে বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করতে পাবনায় চারজন কৃষক ও ৪টি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে ‘প্রাকৃতিক কৃষি সম্মাননা’।
গতকাল শনিবার বিকালে পাবনার আমিনপুরের দয়ালনগর বাহারুন্নেচ্ছা পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে বিকে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই ব্যতিক্রমী সম্মাননা দেওয়া হয়।
কেন এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ?
আয়োজকরা জানান, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে খাদ্যের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিপন্ন হচ্ছে। বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে মাটির স্বাস্থ্য ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যও আজ হুমকির মুখে। একসময়ে কৃষকদের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার ৩৪ শতাংশ থাকলেও সম্প্রতি তা বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন আয়োজকরা।
দেশে প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কেবল ‘অধিক ফলন’ বা উচ্চফলনশীল জাতের উৎপাদনের জন্য পুরস্কৃত করার রেওয়াজ রয়েছে। তবে মাটির স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিষমুক্ত ও নিরাপদ ফসল উৎপাদনের স্বীকৃতিস্বরূপ এমন আয়োজন এই প্রথম।
বিজয়ীদের তালিকা ও পুরস্কার
এবারের আয়োজনে দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রায় ১৫০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আবেদন করেন। সেখান থেকে দুই ক্যাটাগরিতে মোট চারজন কৃষক ও ৪টি প্রতিষ্ঠানকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষক সম্মাননা পেয়েছে ‘কোলে কাপড়া’ কৃষি খামার ও সানোয়ার হোসেন। প্রথম রানার আপ সুলতানা খাতুন ও প্রতিষ্ঠান ‘চাষবাস’। দ্বিতীয় রানার আপ প্রতিষ্ঠান ‘প্রযত্ন’, ও ‘দেশি ফার্ম’, এবং কৃষক শাহাদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ আলী।
এই ব্যতিক্রমী স্বীকৃতি পেয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত দেশের প্রান্তিক কৃষকরা।
বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষক সম্মাননা পাওয়া টাঙ্গাইলের মধুপুরের সানোয়ার বলেছেন, ‘আমি আমার মাকে ঠিক যতটুকু ভালোবাসি, মাটিকেও ততটুকুই ভালোবাসি। ফসল আবাদের নামে মাটির ক্ষতি হয়—এমন কোনো উপকরণ ব্যবহার করি না।’
সানোয়ারের এই কথাটি যেন আজকের অতি রাসায়নিক ও কীটনাশকনির্ভর কৃষিব্যবস্থার বিপরীতে এক ভিন্ন সুর।
রাজশাহীর পবা উপজেলার নারী কৃষক ও প্রথম রানার আপ সুলতানা বললেন, “দেশি বীজ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকদের তা বিনিময় করি। ধান, গম ও পাটসহ সম্পূর্ণ জৈব সার ও প্রাকৃতিক বিতারক পদ্ধতি ব্যবহার করে নিরাপদ সবজি আবাদ করি। প্রাকৃতিক কৃষি আবাদের জন্য এমন সম্মাননা আগে কখনো দেখিনি, এটি আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করবে।”
অতিথিদের বক্তব্য
সম্মাননা প্রদান শেষে প্রাচীন কৃষি উপকরণ নিয়ে গড়া ‘ইমান আলী খান কৃষি জাদুঘর’-এর উদ্বোধন করেন অতিথিরা।
অনুষ্ঠানে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম বললেন, ‘আধুনিক কৃষির নামে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট করা হচ্ছে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা না করতে পারলে আমরা নিরাপদ থাকতে পারব না। এ নিয়ে গবেষণা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারিভাবেও নিরাপদ কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”
কৃষক সম্মাননা পুরস্কারের উদ্যোক্তা ও বিকে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এম. এ. বাতেন খান বলেছেন, ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত না হলে এই সংকট ঘুচবে না। তাই সার ও কীটনাশকের অতি ব্যবহার পরিহার করে সনাতন পদ্ধতির নিরাপদ কৃষি আবাদকে এগিয়ে নিতে আমাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”
কৃষি বিষয়ক ইনফ্লুয়েন্সার জুয়েল রানা বলেছেন, “আমরা নিরাপদ খাদ্যের অভাবে নানা রোগে ভুগে ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতাল বাড়াচ্ছি, কিন্তু নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কোনো পদক্ষেপ নেই। উপকারী পোকা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই উদ্যোগ সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক রেল সচিব সেলিম রেজা, পল্লীকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের, জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমির (নাটা) মহাপরিচালক সাইফুল আজম, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ. এফ. এম. জামাল উদ্দিন, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা মামুনুর রহমান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের পার্টনার প্রকল্পের কনসালটেন্ট ড. মাহবুব আলম, অধ্যাপক ডা. এস. এম. আব্দুর রাজ্জাক এবং পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার প্রমুখ। সঞ্চালনায় ছিলেন শেখ সাইফুর রহমান।




