রোগীর চাপে পা ফেলার জায়গা নেই শরণখোলা হাসপাতালে
- ৫০ শয্যার হাসপাতালে রোগী ভর্তি তিন গুণ
- বারান্দা-ফ্লোরে ঠাঁই রোগীদের
- ডেঙ্গু, হাম, ডায়রিয়া ও সাধারণ রোগী একসঙ্গে
- ১০ দিন ধরে বাজারে নেই নরমাল স্যালাইন

ছবি: আগামীর সময়
রোগীর চাপে পা ফেলার জায়গা নেই বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি থাকছেন প্রায় দেড় শ রোগী। শয্যা না পেয়ে বেশিরভাগ রোগীকে থাকতে হচ্ছে হাসপাতালের বারান্দা ও মেঝেতে। ডেঙ্গু, হাম, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীরা একই স্থানে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা, অন্যদিকে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার অভাবে সুস্থ হওয়ার বদলে নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন রোগীরা।
এর মধ্যে হাসপাতালটিতে রয়েছে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের সংকট। প্রয়োজনের তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় সীমিত জনবল দিয়ে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে ডেঙ্গু, হাম ও ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়লেও গত ৯-১০ দিন ধরে উপজেলার কোনো ফার্মেসিতে পাওয়া যাচ্ছে না রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত নরমাল স্যালাইন। ফলে চিকিৎসাসেবা নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন উপকূলীয় এই উপজেলার মানুষ।
আজ বুধবার শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, রোগী ও তাদের স্বজনদের ভিড়ে হাসপাতালের কোথাও ফাঁকা জায়গা নেই। ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে ভর্তি রয়েছেন প্রায় দেড় শ জন রোগী। এর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৮ জন, হাম আক্রান্ত ৩০ জন এবং ডায়রিয়া রোগী ১০ জন। এ ছাড়া অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছেন আরও ৭০ থেকে ৮০ জন। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে বারান্দা ও মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। একই পরিবেশে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের অবস্থান করায় সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েও চিন্তিত রোগী ও স্বজনেরা।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে স্বজনরাও ভিড় করছেন। একজন রোগীর সঙ্গে একাধিক স্বজন অবস্থান করায় হাসপাতালের পরিবেশ আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। রোগী, স্বজন ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চলাচলে তৈরি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। অনেকটা খোলা বাজারের মতো হয়ে উঠেছে হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ।
হাসপাতালের আরেকটি বড় সমস্যা পর্যাপ্ত শৌচাগার ও গোসলখানার অভাব। নারী ও পুরুষ রোগীদের একই টয়লেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও শৌচাগার ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন না অনেকে। এতে বিশেষ করে নারী রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পাশাপাশি নারী-পুরুষের জন্য পৃথক শৌচাগার না থাকায় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি শরণখোলা উপজেলায় ডেঙ্গু ও হামের প্রকোপ বেড়েছে। পাশাপাশি ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। এসব রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীর চিকিৎসায় নরমাল স্যালাইনের প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু গত প্রায় ১০ দিন ধরে উপজেলার কোনো ওষুধের দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না এই স্যালাইন। ফলে হাসপাতালের বাইরে থেকে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রহ করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনেরা।
উপজেলা সদরের পাঁচরাস্তা মোড়ের ওষুধ ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির তালুকদার, হাসপাতালের পাশের রিপন হাওলাদার, রায়েন্দা বাজারের শাহজাহান গাজীসহ স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ীরা জানান, গত ৯-১০ দিন ধরে বাজারে নরমাল স্যালাইনের সরবরাহ নেই। বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেও স্যালাইন পাওয়া যাচ্ছে না। কোম্পানিগুলোও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছে না বলে জানিয়েছে।
ওষুধ ব্যবসায়ীরা আরও জানান, এলাকায় ডেঙ্গু, হাম ও ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এসব রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নরমাল স্যালাইনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাজারে সরবরাহ না থাকায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ স্যালাইন কিনতে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও কবে নাগাদ স্যালাইন পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না।
হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার রেবা রাণী দেবনাথ বলেন, খাতাপত্রে হাসপাতালে নার্সের পদসংখ্যা ২২ জন। কিন্তু তাদের মধ্যে দুজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে এবং তিনজন উচ্চশিক্ষার জন্য ছুটিতে রয়েছেন। বাকি ১৭ জনের মধ্য থেকে প্রতিদিন পাঁচজনকে বহির্বিভাগ ও বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে হাসপাতালে ভর্তি বিপুলসংখ্যক রোগীর সেবা ও পরিচর্যার জন্য কার্যত ১২ জন নার্স দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, মাত্র ১২ জন নার্স দিয়ে এত বিপুলসংখ্যক রোগীর সেবা দেওয়া খুবই কঠিন। একজন নার্সকে একসঙ্গে অনেক রোগীর দেখাশোনা করতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে আমরাও শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। ঠিকমতো ঘুমানো, খাওয়া-দাওয়ারও সুযোগ হয় না। এভাবে চলতে থাকলে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই দ্রুত জনবল বাড়ানো প্রয়োজন।
রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও অনেক সময় শয্যা পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে বারান্দা কিংবা মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। একই জায়গায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের অবস্থান করায় সংক্রমণের ভয়ও রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক রোগীদের নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন স্বজনেরা। প্রয়োজনের সময় নার্সদের পাওয়া যায় না। এ ছাড়া হাসপাতালের শৌচাগার সংকট ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়েও অভিযোগ করেন তারা।
উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ শরণখোলা উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসা এই ৫০ শয্যার হাসপাতাল। উপজেলার দূরবর্তী ইউনিয়নগুলো থেকে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু জনসংখ্যা ও রোগীর চাপ বাড়লেও হাসপাতালের শয্যা, অবকাঠামো ও জনবল বাড়েনি মোটেই। ফলে প্রতিনিয়তই চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয় গোপাল বিশ্বাসের ভাষ্য, ৫০ শয্যার হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় তাদের জায়গা দিতে পারছি না। বেডের সংখ্যা ৫০টি, সেখানে ডেঙ্গু, হাম ও ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীই ভর্তি রয়েছেন ৫০ জনেরও বেশি। অন্যান্য রোগী রয়েছে আরও ৭০ থেকে ৮০ জন। যে কারণে বারান্দা ও মেঝেতে তাদের রাখতে হচ্ছে।
ডা. প্রিয় গোপাল বলেন, চিকিৎসক, নার্স, পরিচ্ছন্নাকর্মী, শয্যা, অবকাঠামো ও অন্যান্য সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে প্রতিনিয়ত অবহিত করা হচ্ছে। তারা শুধু সংকট পূরণের আশ্বাস দিচ্ছেন, কিন্তু সমাধান হচ্ছে না।
ডা. প্রিয় গোপাল আরো বলেন, হাসপাতালে নরমাল স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে। তবে বাইরে ওষুধের ফার্সিতে নরমাল স্যালাইনের সংকট দেখা দিয়েছে বলে শুনেছি।



