৯০% জীবাণু বহু ওষুধ প্রতিরোধী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর ভয়াবহ বিস্তার শনাক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউনিটটিতে পাওয়া প্রতি ১০টি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের মধ্যে ৯টি বহু ওষুধ প্রতিরোধী (এমডিআর)। এমনকি প্রচলিত ও গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর বিরুদ্ধেও প্রতিরোধের হার ৯৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা শিশুদের গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গবেষকদের মতে, এটি শুধু একটি হাসপাতালের সমস্যা নয়; বরং শিশুস্বাস্থ্য ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকেত, যা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি রাখে।
পিয়ার-রিভিউড এ গবেষণাটি সম্প্রতি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমিতির চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা পত্রিকা ‘জার্নাল অব টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (ভলিউম-৩৯, সংখ্যা-২, ২০২৬)-এ প্রকাশিত হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালিত ওই গবেষণায় রামেক হাসপাতালের পিআইসিইউতে ভর্তি থাকা এক মাস থেকে ১২ বছর বয়সী গুরুতর অসুস্থ শিশুদের কাছ থেকে সংগৃহীত ৪৯টি ব্যাকটেরিয়ার নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়।
এতে দেখা যায়, মোট নমুনার ৬১ দশমিক ২ শতাংশ ছিল গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া, যেগুলো সাধারণত অধিক সংক্রমণক্ষম এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হিসেবে পরিচিত। এসব জীবাণুর ৯০ শতাংশের মধ্যেই বহু ওষুধ প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে।
নমুনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে অ্যাসিনেটোব্যাক্টর বাউমানি কমপ্লেক্স (২৪ দশমিক ৫ শতাংশ)। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া (১৬ দশমিক ৩ শতাংশ)। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ দুটি জীবাণু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। কারণ, এগুলো দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠে এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে জটিল সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে।
গবেষণার ফলাফলে আরও দেখা গেছে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে বহুল ব্যবহৃত শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর অধিকাংশই কার্যকারিতা হারাচ্ছে। গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে ইমিপেনেমের প্রতিরোধের হার ছিল ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ। পাইপেরাসিলিন ট্যাজোব্যাকটাম ও মেরোপেনেমের ক্ষেত্রে এ হার ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ছাড়া সিপ্রোফ্লক্সাসিনে ৯০ শতাংশ, জেন্টামাইসিনে ৮৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং অ্যামিকাসিনে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিরোধ পাওয়া গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, গবেষণার শেষ মাস গত এপ্রিলে শনাক্ত হওয়া সব গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণুই পরীক্ষাধীন ছয়টি প্রথম সারির অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে শতভাগ প্রতিরোধী ছিল। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত যেখানে এ হার ছিল ৮৩ দশমিক ৮ শতাংশ, সেখানে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে।
তবে গবেষণায় টাইগেসাইক্লিন ও কোলিস্টিনকে এখনো তুলনামূলক কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হার পাওয়া গেছে যথাক্রমে ১৩ দশমিক ৩ এবং ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গবেষকদের মতে, গুরুতর গ্রাম-নেগেটিভ সংক্রমণের ক্ষেত্রে বর্তমানে কার্যত এ দুটি ওষুধই শেষ ভরসা হয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে গ্রাম-পজিটিভ ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে আশাব্যঞ্জক। লাইনেজোলিড, ড্যাপটোমাইসিন ও টাইগেসাইক্লিনের প্রতি এসব জীবাণুর শতভাগ সংবেদনশীলতা পাওয়া গেছে। তবে টেইকোপ্লানিনের বিরুদ্ধে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ প্রতিরোধ শনাক্ত হওয়ায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গবেষণাটি বহু ওষুধ প্রতিরোধী সংক্রমণের কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ কারণও চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— আগে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ইতিহাস। যেসব শিশু আগে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে এমডিআর সংক্রমণের ঝুঁকি প্রায় সাত গুণ বেশি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ভেন্টিলেশনে থাকা, সাত দিনের বেশি পিআইসিইউতে ভর্তি থাকা এবং সেন্ট্রাল ভেনাস ক্যাথেটার ব্যবহারের সঙ্গে সংক্রমণের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষণার প্রধান গবেষক রামেক হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল মনে করেন, রামেকের শিশু আইসিইউতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের যে মাত্রা পাওয়া গেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়ও উদ্বেগজনক। তার তথ্য অনুযায়ী, ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন গবেষণায় বহু ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর হার সাধারণত ৭১ থেকে ৮৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও রামেকের পিআইসিইউতে তা ৯০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।




