বন্ধ হয়নি নোটিস দিয়েও টুপটুপ রিসোর্ট, বন্ধ হলো ১০ প্রাণ পুড়ে
- অভিযোগ ছিল অনেক, তবু খোলা ছিল

সংগৃহীত ছবি
পরিবেশ অধিদপ্তর বলেছিল, রিসোর্টটি বন্ধ করতে হবে। নির্দেশনা না মানায় ১ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিসও পরিদর্শন করে জানিয়েছিল, বাঁশ-কাঠের স্থাপনাটি ঝুঁকিপূর্ণ। অগ্নিনিরাপত্তার সনদ নেই, আগুন নেভানোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও নেই। ভবন নির্মাণে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদন নেওয়া হয়নি। তবে এতসব অনিয়মের পরও পর্যটকদের জন্য খোলা ছিল কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্ট।
বন্ধের নোটিস, জরিমানা ও সতর্কতার পরও পুরোদমে চলা পর্যটন ব্যবসা বন্ধ হয়েছে। তবে তার জন্য দিতে হয়েছে ১০ প্রাণ। আহত হতে হয়েছে অন্তত ছয়জনকে। এসবের বিনিময়েই বন্ধ হয়েছে টুপটুপ রিসোর্টের দরজা।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, যে রিসোর্ট বন্ধ করার নোটিস দেওয়া হয়েছিল, সেটি কীভাবে চালু ছিল? ঝুঁকির কথা জানার পরও কেন নিশ্চিত করা গেল না পর্যটকদের নিরাপত্তা? অনিয়ম শনাক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব কি শুধু নোটিস আর জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল? কোন অদৃশ্য শক্তির বলে প্রকাশ্যে ব্যবসা করে যাচ্ছিল একটি অনুমোদনহীন রিসোর্ট?
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, গত শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে টুপটুপ রিসোর্টের ভেতরে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে কাঠের তৈরি তিনতলা ভবনে। সমুদ্রের তীব্র বাতাস আগুনের বিস্তার আরও বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলায় থাকা পর্যটকদের মধ্যে শুরু হয় প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা। কেউ ছোটাছুটি করছিলেন, কেউ চিৎকার করছিলেন। কয়েকজনকে দ্বিতীয়তলা থেকে নিচে লাফ দিতেও দেখা যায়। কিন্তু আগুন আর ধোঁয়ার কারণে ভেতরে ঢুকে সবাইকে উদ্ধার করাও সম্ভব হয়নি।
যারা বেড়াতে এসে রাত কাটানোর জন্য রিসোর্টটিকে বেছে নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ১০ জনের আর বাড়ি ফেরা হয়নি। আগুনে তাদের মরদেহ এতটাই বিকৃত হয়েছে যে, পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরও কোন মরদেহটি কার, তা শনাক্ত করতে প্রয়োজন হচ্ছে ডিএনএ পরীক্ষা। কক্সবাজারে এ পরীক্ষার ল্যাব না থাকায় নমুনা পাঠাতে হবে ঢাকায়। স্বজনদের অপেক্ষা তাই আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্টহাউজ অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিমের মতে, এই মৃত্যু শুধু একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে রিসোর্ট পরিচালনায় অনিয়ম, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদারকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।
আগুন কীভাবে লেগেছে, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘তার আগেই যেসব তথ্য জানা গেছে, সেগুলো সামনে আনছে আরও অস্বস্তিকর বাস্তবতা। রিসোর্টটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, ঝুঁকির কথাও জানানো হয়েছিল অথচ পর্যটকদের জন্য সেটি চালু ছিল।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার অঞ্চলের পরিচালক জমির উদ্দিন জানিয়েছেন, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার কারণে গত এপ্রিলে টুপটুপ রেস্টুরেন্ট ও রিসোর্টকে বন্ধের নোটিস দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশনা অমান্য করায় পরের মাসের ১৩ তারিখে প্রতিষ্ঠানটিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। রিসোর্টটির কউকের অনুমোদিত নকশা ছিল না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়নি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানিয়েছেন, রিসোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। সেখানে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোসপাইপ কিংবা অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনাও ছিল না।
ভবনটির কাঠামো দেখলেও ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট হয়। গতকাল রবিবার দুপুরে দেখা যায়, তিনতলা ভবনটির প্রথম ও দ্বিতীয়তলার মেঝে ছিল কাঠের পাটাতনের। নিচতলা থেকে ওপরের তলায় ওঠানামার সিঁড়িতে লোহার কাঠামোর ওপর বসানো হয়েছিল কাঠের তক্তা। ছাদ ছিল টিনের। পশ্চিম পাশে গাছের খুঁটির ওপর কাঠের বর্ধিত অংশে চলত রেস্তোরাঁ। সেখানে ব্যবহৃত বেশিরভাগ খুঁটি ছিল ঝাউ ও আকাশমণি গাছের। নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ ও খাবার তৈরির ব্যবস্থা। ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার কক্ষ। অথচ এত মানুষের যাতায়াত ও অবস্থানের জায়গাটিতে অগ্নিনিরাপত্তার মৌলিক ব্যবস্থাই ছিল না বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
এত এত অনিয়ম নিয়ে কীভাবে রিসোর্টটি চলছিল সে প্রশ্ন ছিল পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশার কাছে। তিনি জানালেন, পরিবেশ আইনে নোটিস ও জরিমানা করার সুযোগ থাকলেও কোনো স্থাপনা উচ্ছেদ বা সরাসরি বন্ধ করার ক্ষমতা তাদের সীমিত। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হলো, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রসঙ্গ।
তবে আইনি ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকলে অনিয়ম বন্ধে অন্য দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, সে প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে দোকানপাটসহ প্রায় ১৫০টি অবৈধ হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের তালিকা তাদের কাছে রয়েছে।
সরকার ১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। পরিবেশ সংরক্ষণের বিশেষ গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও সেখানে রিসোর্ট, রেস্তোরাঁসহ নানা ধরনের স্থাপনা গড়ে উঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ নিতে গেলে নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়।
সামাজিক সংগঠন আমরা কক্সবাজারবাসীর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন বলছিলেন, এসব স্থাপনার বিরুদ্ধে কোন সংস্থা কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং কেন অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পেরেছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তার মতে, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ড তাই শুধু একটি ভবন পুড়ে যাওয়ার ঘটনা নয়— এটি পর্যটকদের নিরাপত্তা, অবৈধ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার কঠিন পরীক্ষা।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকাও মনে করেন, শুধু আগুনের কারণ অনুসন্ধান করলেই এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না। আগে নোটিস দেওয়া হয়েছিল কি না, জরিমানার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন ছাড়াই কীভাবে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা চালু ছিল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদারকিতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না— এসব প্রশ্নের উত্তরও জরুরি।
আগুনের ঘটনায় রিসোর্টের মালিক মো. তানভীরকে প্রধান আসামি করে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় রিসোর্টের মালিক তানভীর ও তার ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোর্শেদের নাম উল্লেখ রয়েছে। রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনকে আটক করে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এ ছাড়া ঘটনার তদন্তে জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন করে প্রতিনিধি। গতকাল সকালে তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলছিলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আমরা আগুন লাগার কারণ, পর্যটকদের মৃত্যুর ঘটনায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও নথিপত্র ছিল কি না এবং অবকাঠামোগত কী কী সমস্যা ছিল, তা খতিয়ে দেখেছি। এ বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন। যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’



