চাঁদপুর
সৌদিতে হত্যা করে মরুভূমিতে বালুচাপা, নিজ গ্রামে ফিরল জসিমের মরদেহ

গতকাল শনিবার নিজ গ্রামে জসিমের মরদেহ পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। ছবি: আগামীর সময়
এক বুক স্বপ্ন ও পরিবারের সচ্ছলতার আশা নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন চাঁদপুরের জসিম উদ্দিন। কিন্তু সেখানে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তিনি। সৌদি আরবের মরুভূমি থেকে বালুচাপা দেওয়া অবস্থায় উদ্ধার করা তার মরদেহ দীর্ঘ ৪১ দিন পর অবশেষে নিজ বাড়িতে এসে পৌঁছেছে।
গতকাল শনিবার নিজ গ্রামে জসিমের মরদেহ পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। কফিনের সামনে আহাজারি করতে দেখা যায় জসিমের তিন মেয়েকে। স্বামীকে হারিয়ে শোকে পাথর স্ত্রী রুমা আক্তার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে এখন তিন সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি তিনি।
নিহত জসিম মতলব উত্তর উপজেলার ঘাসিরচর গ্রামের আইয়ুব আলীর ছেলে। তার বড় মেয়ে জাকিয়ার বিয়ে হয়েছে। মেজ মেয়ে আয়েশা ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে জেসিয়া দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করে।
পরিবারের স্বপ্ন ছিল, প্রবাসে পরিশ্রম করে সন্তানদের লেখাপড়া করাবেন, গড়ে তুলবেন সুন্দর ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে নির্মম হত্যাকাণ্ড।
স্বামী হত্যার বিচার দাবি করে রুমা জানান, স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তান নিয়ে তিনি এখন অসহায়। যারা তার স্বামীকে হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তিনি। কোনো স্ত্রী ও সন্তান যেন এভাবে স্বজন হারানোর যন্ত্রণা নিয়ে জীবন কাটাতে বাধ্য না হয়, সেই প্রত্যাশা তার।
মেজ মেয়ে আয়েশার কাছে বাবাকে হারানোর শোক যেন জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট। যে বাবার হাত ধরে বড় হওয়ার স্বপ্ন ছিল, সেই বাবার কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে বিদায় জানাতে হয়েছে। বাবার আদর, ভালোবাসা ও সান্নিধ্য হারিয়ে দিশেহারা আয়েশা। বাবার হত্যাকারীদের বিচার চায় এই শিশুকন্যাও।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ১৯ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের আল কাসিম এলাকায় প্রায় চার লাখ টাকা পাঠানোর উদ্দেশ্যে এক সহকর্মীর সঙ্গে বের হন জসিম। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিলেন তিনি। নিখোঁজের কয়েক দিন পর আল কাসিমের একটি মরুভূমি থেকে বালুচাপা অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, জসিমকে হত্যা করে মরদেহ বালুর নিচে চাপা দেওয়া হয়। পরে তার মোবাইল ফোন থেকে স্ত্রী ও স্বজনদের কাছে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এ ঘটনায় সৌদি পুলিশ মো. সাব্বির নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মতলব উত্তর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।
যুব অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মর্তুজা মাহবুব জানান, তার এলাকার একজন প্রবাসী বিদেশে নিহত হয়েছেন। তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা তাদের দায়িত্ব মনে করেই প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে দ্রুত মরদেহ দেশে আনার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। অবশেষে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়েছে।
মরদেহ দেশে ফেরানোর সহযোগিতার জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন জসিমের পরিবারের সদস্যরা। জানাজা শেষে প্রতিমন্ত্রী নুরুল শোকাহত পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
তবে জসিমের মরদেহ দেশে ফিরলেও তার হত্যার বিচার এখনো পরিবারের কাছে বড় প্রত্যাশা। স্ত্রী রুমার দাবি, স্বামী হত্যার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তিন কন্যার পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ জীবন নিশ্চিত করতে সরকারের সহযোগিতাও কামনা করেছেন তিনি।




