চায়ের দামে এনটিসির রেকর্ড, উৎপাদন বেড়েছে ২৫ শতাংশ

ছবি: আগামীর সময়
চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক চা-নিলামে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গড় দামে চা বিক্রি করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড (এনটিসি)। গত ৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত নিলামে প্রতিষ্ঠানটির অধীন ১২টি চা-বাগানের ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৬০ কেজি চা বিক্রি হয়। প্রতি কেজি চায়ের গড় দাম ছিল ২৮০ টাকা ৫৯ পয়সা। এটি এনটিসির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গড় বিক্রয়মূল্য।
এ নিলামে সরকার নির্ধারিত ২৪৫ টাকা ভিত্তিমূল্যের চেয়ে বেশি দামে চা বিক্রি হওয়ায় এনটিসির আয় হয়েছে ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৭৩ হাজার ৭২২ টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং চায়ের গুণগত মান উন্নয়নের কারণে এবার নিলামে এনটিসির চায়ের চাহিদা ও দাম বেড়েছে।
নিলামে অংশ নেওয়া এনটিসির বাগানগুলোর মধ্যে রয়েছে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর ও তেলিয়াপাড়া, চুনারুঘাটের চণ্ডীছড়া ও পারকুল এবং মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার পাত্রখোলা, কুর্মা, চম্পারাই, মদনমোহনপুর, লাক্কাতুরা, মাধবপুর প্রেমনগর ও বিজয়া চা-বাগান। এসব বাগানের উন্নতমানের অর্থোডক্স ও সিটিসি চায়ের কয়েকটি লট প্রত্যাশার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হয়েছে।
জগদীশপুর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক মনির উদ্দিন বলেছেন, এ বছর বৃষ্টিপাত গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এতে দীর্ঘ সময় পর বাগানে চা উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়া উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মনির উদ্দিন বললেন, সরকার চলতি বছর চা পাতার মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। এনটিসির বাগানগুলোতে উৎপাদিত চা পাতার গুণগত মান ভালো হওয়ায় নিলামে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়া গেছে। ভালো মানের কাঁচা পাতা এবং সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে বাজারে এনটিসির চায়ের চাহিদাও বেড়েছে।
তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ব্যবস্থাপক দেওয়ান বাহাউদ্দিন লিটনের দাবি, চায়ের গুণগত মান বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, বাগানে নিবিড় তদারকি এবং ‘দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি’ চয়ন নীতি কঠোরভাবে অনুসরণের ফলে কাঁচা পাতার মান উন্নত হয়েছে। এতে উৎপাদিত চায়ের রং, ঘ্রাণ ও স্বাদেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
এনটিসির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) রফিকুল ইসলাম উল্লেখ করলেন, চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির চা উৎপাদন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কারখানায় মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে উৎপাদন ও বিক্রি—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনিয়মিত আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রম ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি দেশের চা শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে চলতি মৌসুমে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি, কাঁচা পাতার মানোন্নয়ন এবং উৎপাদন বাড়ায় এনটিসির বাগানগুলোতে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
এনটিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হাসান বললেন, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বাগানশ্রমিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বাগানগুলো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধি ও মানোন্নয়নে নেওয়া বিশেষ কর্মসূচির সুফল এখন দেখা যাচ্ছে। আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মৌসুমের বাকি সময়ে আরও ভালো উৎপাদন ও বিক্রির আশা করছেন তারা।
জিয়াউল হাসানের দাবি, দেশের চা শিল্পের টেকসই উন্নয়নে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা, উন্নত জাতের চারা রোপণ, কারখানার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এনটিসিকে আরও লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে।




