অপরিকল্পিত উন্নয়নে পথ হারাচ্ছে ‘সাগরকন্যা’
- কাজে লাগছে না পদ্মা সেতুর সম্ভাবনা
- পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে উঠছে স্থাপনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা। একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল বৈশিষ্ট্যের কারণে পরিচিতি পেয়েছে ‘সাগরকন্যা’ নামে। এই সমুদ্রসৈকত পরিকল্পিত পর্যটননগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ২০১৩ সালে প্রণয়ন করা হয় মাস্টারপ্ল্যান। এরপর এক যুগ পেরিয়ে গেলেও পায়নি সাফল্য। বাস্তবায়িত হয়নি পুরোপুরি। পরিণতি যা হওয়ার তাই হচ্ছে; পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে উঠছে হোটেল, রিসোর্ট ও বহুতল ভবন। একই সঙ্গে প্রশাসনিক জটিলতা, অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং স্বতন্ত্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অভাবে থমকে যাচ্ছে নতুন বিনিয়োগ।
অন্যদিকে কক্সবাজার ঘিরে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটননগরী গড়ে তুলতে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা এখনো অপেক্ষায় রয়েছে নিজস্ব পরিকল্পিত উন্নয়নের। ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রকাশ হয় কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যানের গেজেট। তবে পরে নতুন কয়েকটি উন্নয়ন পরিকল্পনা যুক্ত হওয়ায় দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায় মূল পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। এই সুযোগে কার্যকর নগর-পরিকল্পনা ছাড়াই সৈকতসংলগ্ন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠছে বহু স্থাপনা।
কুয়াকাটা পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই প্রশাসনিক এলাকায় আবাসিক হোটেল ১৭০টি। এর মধ্যে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন রয়েছে হাতেগোনা মাত্র কয়েকটির। বাকি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন পর্যায়ে পরিচালিত হলেও আসেনি পরিকল্পিত নগরায়ণের আওতায়। নতুন ভবন নির্মাণ কিংবা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বাধীন কমিটির অনুমোদন।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, এই অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় নিরুৎসাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে জমি কেনাবেচাও অনেক ক্ষেত্রে স্থবির হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। শুধু তাই নয়, পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটনশিল্পে যে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছিল, লুফে নেওয়া যায়নি তা। ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় কুয়াকাটায় পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। শুরুতে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেলেও পরে ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে পর্যটকের সংখ্যা।
কুয়াকাটার অভিজাত শিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলাসের এজিএম আলামিন খান জানালেন, ২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালুর পর কুয়াকাটায় পর্যটকের ঢেউ বাড়ছিল ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়ায় এখন শুধু কমছে। এতে লোকসানে পড়ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু পর্যটক কমে যাওয়াই নয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার অভাবও ক্ষুণ্ন করছে কুয়াকাটার ভাবমূর্তি। ভারী বৃষ্টি হলেই পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। বিশেষ করে, সদর রোডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে কোনো রকম এক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই জমে পানি, দুর্ভোগ তৈরি হয় চলাচলে। নেই আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থাও।
‘২০১৬ সালে ১৯ শেয়ারহোল্ডার মিলে হোটেল নির্মাণের উদ্যোগ নিই। সরকারি সব নিয়ম মেনে আবেদন করলেও দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে এখনো মেলেনি চূড়ান্ত অনুমোদন। এমন অনেক ভবনের অনুমোদন ও জমি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে থমকে আছে সম্ভাব্য বিনিয়োগ’— আক্ষেপ জানালেন পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে নির্মাণাধীন পানশি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের শেয়ারহোল্ডার এস এম আলমাস।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষারের ভাষ্য, পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য স্বতন্ত্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয়, সৈকত রক্ষায় স্থায়ী প্রকল্প, দ্রুত মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ, মহাসড়ক উন্নয়ন এবং আধুনিক ড্রেনেজ ও সুয়ারেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়বে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্র।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম মোতালেব শরীফ বললেন, অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও ঝুলে আছেন প্রশাসনিক জটিলতায়। তাই দ্রুত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন সময়ের দাবি।
“২০১৩ সালের মাস্টারপ্ল্যান দীর্ঘদিন বাস্তবায়ন না হওয়ায় অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণের কারণে কুয়াকাটার উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র ও পর্যটন পরিবেশ ঝুঁকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় ক্ষয় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়ছে। পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন নিশ্চিতকরণ এবং একটি স্বতন্ত্র ‘কুয়াকাটা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ গঠনের বিকল্প নেই”— তাগিদ দিলেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের ডিজাস্টার রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. রমন কুমার বিশ্বাস।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামানের আশ্বাস, কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকার। আর অনুমোদন ছাড়া যেসব ভবনের নির্মাণকাজ চলছে, সেগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী নেওয়া হবে ব্যবস্থা।
কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বরিশালের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) সোহরাব হোসেনের জবাব, পরিকল্পনাটি প্রণয়ন করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এটি কেন এখনো বাস্তবায়ন হয়নি, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ই সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারবে। আর অনুমোদনের বিষয়টি একটি কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে করা হয়। এতে কিছুটা সময়তো দিতেই হবে।






