জনবল সংকটে ধুঁকছে ১১৫ বছরের পাকশী রেলওয়ে হাসপাতাল

রেলওয়ে হাসপাতাল পাকশী। ছবি: আগামীর সময়
পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত ১১৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী পাকশী রেলওয়ে হাসপাতাল জনবল সংকট, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব ও অব্যবস্থাপনায় ধুঁকছে। একসময় যেখানে রোগীদের ভিড় সামলাতে চিকিৎসক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হতো, সেখানে এখন রোগী ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ।
প্রতিদিন বহির্বিভাগে আসা ৮০ থেকে ১০০ জন রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র দিয়েই দায় সারতে হচ্ছে। গুরুতর রোগীদের পাঠানো হচ্ছে অন্য হাসপাতালে।
হাসপাতালটির ৮৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৮ জন। শূন্য ৬৮টি পদ। পাঁচজন চিকিৎসকের বিপরীতে আছেন মাত্র দুজন। তাদের একজন বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা (ডিএমও) সপ্তাহে তিন দিন পাকশী ও দুই দিন রাজশাহী রেলওয়ে হাসপাতালে রোগী দেখেন।
অন্যদিকে সহকারী সার্জন রাজবাড়ীসহ অন্যান্য হাসপাতালে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করায় সপ্তাহের বেশির ভাগ সময়ই পাকশী হাসপাতালে চিকিৎসক থাকেন না। ছয়জন সিনিয়র স্টাফ নার্সের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন।
এ ছাড়া সিস্টার ইনচার্জ, স্টোরকিপার, সিনিয়র স্যানিটারি পরিদর্শক ও প্রধান সহকারীসহ শূন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ।
সরেজমিন দেখা গেছে, জনবল ও আধুনিক সরঞ্জামের অভাবে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রায় ২৮ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে অপারেশন থিয়েটার (ওটি)। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় মাতৃমঙ্গল ইউনিটটি ১৯৯০ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়। হাসপাতালের দক্ষিণ পাশে থাকা পৃথক যক্ষ্মা ও ডায়রিয়া চিকিৎসা ভবনটিও ১৯৯৬ সাল থেকে বন্ধ। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। সেখানে বেড়েছে বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রবও।
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হাসপাতালটির ময়নাতদন্ত কক্ষও। ১৯৯০ সালের পর থেকে সেখানে আর ময়নাতদন্ত হয় না। এখন কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠাতে হয় পাবনা জেলা সদরে।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণ ও পাকশী বিভাগীয় শহর প্রতিষ্ঠার সময় রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ১৯০৯ সালে ‘পাকশী রেলওয়ে ডিসপেনসারি’ নামে হাসপাতালটির যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৬৩ সালে পদ্মা নদীর তীরে তিন একর জমিতে নির্মিত ৪৪ শয্যার নতুন ভবনে এটি স্থানান্তর করা হয়। তখন এর নামকরণ করা হয় রেলওয়ে হাসপাতাল পাকশী।
একসময় পাকশী রেলওয়ে বিভাগের আওতাধীন জয়দেবপুর থেকে ঈশ্বরদী, খুলনা থেকে হিলি এবং পোড়াদহ থেকে ভাঙ্গা ও গোপালগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকার রেল কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা এখানে চিকিৎসাসেবা নিতেন। একসময় হাসপাতালে দেড় শতাধিক রোগী ভর্তি থাকতেন। শয্যা না পেয়ে অনেককে মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হতো। অথচ বর্তমানে রোগী ভর্তি কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ।
রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হাসপাতালে গিয়েও প্রায়ই চিকিৎসক পাওয়া যায় না। চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে কর্মরত একমাত্র সিনিয়র স্টাফ নার্স মমতাজ বেগমের পরামর্শে ফার্মাসিস্টরা ওষুধ সরবরাহ করেন। তাদের দাবি, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণের কারণে রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
হাসপাতালের একমাত্র সিনিয়র স্টাফ নার্স মমতাজ বেগম জানান, ছয়জনের কাজ তাকে একাই সামলাতে হয়। দায়িত্বে না থাকলেও জরুরি প্রয়োজনে তাকে হাসপাতালে ছুটে আসতে হয়।
পাকশী রেলওয়ের বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা (ডিএমও) ডা. মো. শাকিল আহমেদ জানিয়েছেন, ঐতিহ্যবাহী এ হাসপাতালে এখন প্রয়োজনীয় জনবলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। জনবল বাড়ানো গেলে হাসপাতালটি আবার আগের অবস্থায় ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
পাকশী রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন করা গেলে সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি হাসপাতালের অন্যান্য সমস্যারও দ্রুত সমাধান সম্ভব।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের (রাজশাহী) প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. আনিছুল হক জানিয়েছেন, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের হাসপাতালগুলোয় অন্তত ৩৭ জন চিকিৎসক প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র সাতজন। ফলে একজন চিকিৎসককে একাধিক স্থানে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ সংকটের কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। নতুন নিয়োগ ছাড়া এ সংকট নিরসন সম্ভব নয়।




