চাহিদা ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, মিলছে ১৬

ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মাদারীপুর শিবচরের লাখো মানুষ। জনজীবনের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায়ও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শিবচরে বর্তমানে প্রায় ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৬ থেকে ১৭ মেগাওয়াট। ফলে বাধ্য হয়েই এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করা হচ্ছে।
শিবচরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দিনের তীব্র তাপ প্রবাহ ও রাতের গুমোট আবহাওয়ার মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিং মানুষের দুর্ভোগ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তীব্র গরমে অনেকে ঘরের বাইরে সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ দোকানের সামনে, কেউ রাস্তার পাশে, আবার কেউ খোলা জায়গায় বসে সামান্য স্বস্তি খুঁজছেন। রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুম যেন অনেকের কাছেই বিলাসিতা হয়ে উঠেছে।
বিদ্যুতের সংকটে মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া, পানির মোটর চালানো এবং খাবার সংরক্ষণের মতো দৈনন্দিন কাজও ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীরা।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় ক্রেতার উপস্থিতি কম। ফ্রিজনির্ভর ব্যবসা, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কম্পিউটার ও ফটোকপি সেবা, মোবাইল সার্ভিসিং এবং ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
হোটেল ব্যবসায়ী নিয়ামত আলী বলেছেন, ‘কারেন্ট না থাকার কারণে খাবার পচে যাচ্ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের বড় ক্ষতি হচ্ছে।’
শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রুবিনা ইসলাম বললেন, ‘সরকারি হাসপাতালেও থাকে না কারেন্ট। বাচ্চা নিয়ে বড় কষ্টে আছি। রোগের চাইতে গরমের কষ্ট সব চাইতে বেশি।’
ভ্যানচালক রুবেল মিয়া জানিয়েছেন, নিয়মিত ব্যাটারি চার্জ দিতে না পারায় আগের মতো ভ্যান চালাতে পারছেন না। এতে তার আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংসারের ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সামনে অর্ধবার্ষিক ও এইচএসসি পরীক্ষা থাকলেও বিদ্যুৎ সংকটে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম জানায়, সন্ধ্যার পর দীর্ঘ লোডশেডিং ও অসহনীয় গরমের কারণে পড়ার পরিবেশ পাওয়া যাচ্ছে না।
এইচএসসি পরীক্ষার্থীর অভিযোগ, ‘এভাবে কারেন্ট চলে গেলে আমাদের পড়ালেখার অনেক ক্ষতি হয়। আমরা ঠিকমতো পড়তে পারি না। সামনে আমাদের এইচএসসি পরীক্ষা। পড়ালেখা না করলে ভালো রেজাল্ট করতে পারব না।’
৭০ বছর বয়সী রব মাদবর জানান, উচ্চ রক্তচাপের রোগী হওয়ায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর।
২০২২ সালে শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায় শিবচর। বিদ্যুতের গ্রাহক ১ লাখ ৩৫ হাজার। পাঁচটি উপকেন্দ্র ও প্রায় ২ হাজার ৮৪৫ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইনের মাধ্যমে সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে গ্রাহকদের কাছে প্রায় ১০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল বকেয়া।
শিবচর পল্লী বিদ্যুতের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার অভিলাষ চন্দ্র পাল বলেছেন, ‘শিবচরে বর্তমানে প্রায় ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৬ থেকে ১৭ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ব্যবধান সামাল দিতে বাধ্য হয়েই এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করতে হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’





