‘মোর সব শেষ হয়া গেল’, আগুনে শেষ অশোক-চানু দম্পতির সংসার

‘মোর সব শেষ হয়া গেল’– আক্ষেপ করে কাঁদছেন চানু বালা
‘মোর সব শেষ হয়া গেল’– আক্ষেপ করে কথাটি বললেন চানু বালা। রংপুরের গঙ্গাচড়ায় অগ্নিকাণ্ডে তার স্বামী অশোক ও স্বামীর ছোট ভাইয়ের চারটি বসতঘর পুড়ে গেছে। সঙ্গে পুড়েছে জমি কেনার জন্য জমানো নগদ টাকা ও মেয়ের স্বর্ণালংকার। ঘরে বাঁধা একটি গরু ও তিনটি ছাগলও মারা গেছে।
গতকাল বুধবার রাত কেটেছে পোড়া টিন দিয়ে বানানো ছোট একটি চালাঘরে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, যেখানে গতকালও সংসার ছিল, সেখানে এখন শুধু পোড়া টিন, বাঁশ আর কাঠের টুকরো। স্বামীর পাশে বসে ছিলেন চানু বালা। কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, এতগুলা ঋণ ক্যামন করি পরিশোধ করিমো? মোর বেটির এই স্বর্ণ ক্যামন করি দিম? মোর সব শেষ হয়া গেল।
গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় উপজেলার সদর ইউনিয়নের নবনীদাস মাঠের পাড় এলাকায় আগুন লাগে। এতে অশোক চন্দ্র রায়ের তিনটি ও তার ছোট ভাই নরেশ চন্দ্র রায়ের একটি ঘর পুড়ে যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দাবি, জমানো তিন লাখ টাকা ও প্রায় দুই লাখ টাকার স্বর্ণালংকারসহ তাদের ক্ষতি প্রায় আট লাখ টাকা। অশোক চন্দ্র রায়ের বয়স ৫০ বছর। কারও বাগানে নারকেল-খেজুরগাছের ডাল কাটেন, কারও বাগানে কীটনাশক দেন। এলাকায় ঘুরে ঘুরে যে কাজ পান, তা দিয়েই চলে সংসার। দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে তিন-চার বছর আগে। ছেলে কাজের খোঁজে ঢাকায় থাকেন।
অশোক বলেন, বাপের কাছ থেকে দুই শতক জমি পাইছি। এইটুকু জমির ওপর কষ্ট করে বাড়ি করছি। ছেলে বড় হয়েছে, বিয়ে দিতে হবে। এ জন্য ৫০ হাজার টাকা কিস্তিতে ঋণ নিয়েছি। আর এলাকায় ঘুরে কাজকাম করে কিছু টাকা জমাইছিলাম। ভাবছিলাম, কিছু জমি কিনে বাড়ি করব, ছেলেকে বিয়ে দেব। কিন্তু আগুনে সব শেষ হয়ে গেল। মেয়ের বিয়েতে ধারদেনা করে প্রায় দুই লাখ টাকার স্বর্ণালংকার দিয়েছিলেন অশোক। মেয়ের সন্তান হওয়ার সময় মেয়ে সেই গয়না মায়ের কাছে রেখে গিয়েছিলেন। আগুনে সেই গয়নাও পুড়ে গেছে। মেয়েকে এখন কীভাবে তা ফিরিয়ে দেবেন, চানু বালার কান্নায় ছিল সেই প্রশ্নই। প্রতিবেশী গোলাপী রানী প্রথম আগুন দেখতে পান।
তিনি বলেন, সন্ধ্যায় পূজাপাঠ শেষ করে বাইরে বেরিয়ে দেখেন, ঘরের টিনের চাল দিয়ে দাউ দাউ করে আগুন বের হচ্ছে। তখন চিৎকার দিই। আমার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আগুন নেভানো যায়নি।
কিছুক্ষণ থেমে গোলাপী রানী আরও বলেন, ঘরে বাঁধা গরু-ছাগলগুলো গলা ফাটিয়ে ডাকছিল। ফায়ার সার্ভিস আসার পর আগুন নিভেছে, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
স্থানীয় লোকজন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এলেও সরু রাস্তার কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে। আগুনের উৎস নিয়ে পরিবারের ধারণা, বাড়ির পূজার ঘর থেকে আগুন লেগে থাকতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি।
গঙ্গাচড়া ফায়ার স্টেশনের ফায়ার ফাইটার আরিফুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। এতে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাদের যাওয়ার আগে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের হিসাব ও পরিবারের দাবির মধ্যে ফারাক আছে। তবে এই হিসাব-নিকাশের চেয়ে অশোক ও চানু বালার কাছে এখন বড় প্রশ্ন, কোথায় দাঁড়াবেন আর কীভাবে আবার শুরু করবেন।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার আগামীর সময়কে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বিষয়টি তারা জেনেছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
এদিকে রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে আগামীর সময়কে বলেন, প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে শুকনা খাবার ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে তাদের টিন ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এ সময় তিনি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদেরও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।




