‘সুখবর’ প্রচারণায় বিরক্ত কাপাসিয়াবাসী

ছবি: আগামীর সময়
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত উচ্চ শব্দে মাইকিং ও প্রচারণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। অটোরিকশায় মাইক বেঁধে বিভিন্ন পণ্য, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও নানা অনুষ্ঠানের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন সড়ক, বাজার ও জনবসতিতে চলে মাইকিং। একটি প্রচারণা শেষ হওয়ার আগেই শুরু হয় আরেকটি। কোথাও কোথাও রাতভর উচ্চ স্বরে গানবাজনারও অভিযোগ রয়েছে। এতে শিশু, শিক্ষার্থী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। নামাজ, পড়াশোনা ও বিশ্রামের সময়ও মিলছে না স্বস্তি।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের আগমন, ক্লিনিক ও হাসপাতালের সেবা, কম দামে লাইট বিক্রি, গরু-মহিষ জবাইয়ের প্রচারণা, ফুটবল খেলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও কোচিংয়ের বিজ্ঞাপনসহ নানা বিষয়ে মাইকিং করা হয়। এসব প্রচারণায় শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থাকে।
শব্দদূষণের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, উচ্চ শব্দে মাইকিংয়ের কারণে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে সমস্যা হয়। শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ইসমাইল, সুমন সরকার, সুরাইয়া আক্তার, তানজিম ও মারজিয়া বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের তোয়াক্কা না করে প্রতিদিন উচ্চ শব্দে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ‘সুখবর, সুখবর’ শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। এতে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
কাপাসিয়া ইউনিয়নের দস্যুনারায়ণপুর গ্রামের পোল্ট্রি ব্যবসায়ী মাওলানা সাইফুল ইসলাম বলেন, একটি প্রচারণা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি শুরু হয়। বিশেষ করে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের প্রচারণায় পরিবেশের বিষয়টি উপেক্ষা করা হচ্ছে। নামাজের সময়ও মাইকিং বন্ধ রাখা হয় না। এভাবে চলতে থাকলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়বে।
বীর উজলী বাজারের স্বর্ণকার নির্মল চন্দ্র বণিক কিংকর বলেন, মাইকের শব্দে দোকানে বসে থাকাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বেচাকেনার সময় ক্রেতাদের কথাও ঠিকমতো শোনা যায় না। এতে ব্যবসার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
তরগাঁও এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, দিন-রাত উচ্চ শব্দে মাইকিং চলায় তিনি অতিষ্ঠ। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন তিনি।
জাতীয় নাক-কান-গলা (ইএনটি) ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. শাহজাহান সরকার বলেন, উচ্চ শব্দে মাইকিং মানুষের শ্রবণশক্তির ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া বা বধিরতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া কানে ভোঁ ভোঁ বা শোঁ শোঁ শব্দ, মানসিক চাপ, বিরক্তি, অস্থিরতা ও উদ্বেগ বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত শব্দে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে শিশুদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যেতে পারে। বয়স্ক ব্যক্তি, অসুস্থ মানুষ ও নবজাতকেরা উচ্চ শব্দে বেশি ভোগান্তির শিকার হন। দীর্ঘদিন শব্দদূষণের মধ্যে থাকলে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ডা. শাহজাহান সরকার বলেন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় অপ্রয়োজনীয় উচ্চ শব্দ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, চিকিৎসা, পড়াশোনা ও বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটায়। তাই প্রচারণার সময় ও শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
কাপাসিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, উচ্চ স্বরে মাইকিং বা অন্য কোনো প্রচারণার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে স্বাস্থ্য বিভাগ সহযোগিতা করবে। প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত শব্দে শিশুদের ক্ষতির আশঙ্কা বেশি। শ্রবণশক্তি হ্রাসসহ কানের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাফিজুল হক বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেন মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




