উপকূলে জোটে না পূজার পদ্ম

পূজার পদ্মফুল সংগ্রহ করতে এখন আর গ্রামের পুকুরে গেলেই চলে না। বিলের পাড়ে কিংবা জলাশয়ের ধারেও সহজে মেলে না সেই চেনা ফুল। কখনো দূরের বাজারে ছুটতে হয়, কখনো খোঁজ নিতে হয় অন্য জেলার। তাতেও প্রয়োজনীয় পদ্ম না মিললে সীমান্ত পেরিয়ে ফুল আনার ব্যবস্থা করতে হয় ভারত থেকে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে পদ্মের এই সংকট কঠিন করে তুলছে পূজার আয়োজন। একই সঙ্গে ফিকে হয়ে আসছে উপকূলের মানুষের শৈশবের স্মৃতি, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক আর ধর্মীয় সংস্কৃতির পরিচিত এক অনুষঙ্গ।
ঈশ্বরীপুর যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরের পূজারি দিলীপ চক্রবর্তীর কণ্ঠে তাই শুধু ফুলের অভাবের আক্ষেপ নয়, আছে হারিয়ে যাওয়া একসময়ের বেদনাও। বলছিলেন, ‘আগে পূজার সময় এলাকার বিল, পুকুর ও জলাশয়েই পদ্ম পাওয়া যেত। এখন সেসব জায়গায় পদ্ম দেখা যায় না। দূর থেকে ফুল কিনে আনতে হয়, অনেক সময় চাহিদামতো পদ্মও পাওয়া যায় না। মায়ের পূজায় যে ফুল ছাড়া চলে না, সেটির জন্য এভাবে হন্যে হয়ে ঘুরতে হবে, কখনো ভাবিনি।’
দুর্গাপূজার বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে পদ্মের। সন্ধিপূজায় প্রচলন আছে ১০৮টি পদ্ম নিবেদনের। অথচ যে ফুল একসময় গ্রামের জলাশয় থেকেই সহজে সংগ্রহ করা যেত, এখন তা জোগাড় করাই হয়ে উঠেছে দুশ্চিন্তার বিষয়। ফুলের জন্য বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে, নির্ভর করতে হচ্ছে দূরের সরবরাহের ওপর। প্রয়োজনের সময় পদ্ম পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও থাকছে অনিশ্চয়তা।
মানিকখালী সার্বজনীন পূজামণ্ডপের আয়োজক কমিটির সদস্য প্রসেনজিৎ কুমার মণ্ডল জানালেন, গত বছর তাদের পূজার জন্য পদ্মফুল আনতে হয়েছিল ভারত থেকে। এবারও দেশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত ফুল না পেলে ভারত থেকে আনার প্রস্তুতি রয়েছে। তার দাবি, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে তাদের এলাকার জলাশয়গুলোয় আর দেখা যায় না পদ্মফুল।
সংকটটি মানিকখালীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জেলেখালি, শ্যামনগর পৌর সদরের কাঁচড়াহাটি, নকিপুর হরিসভা মন্দির ও নকিপুর ব্রাহ্মণপাড়া মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপের আয়োজকদের কাছ থেকেও পদ্মের অভাবের কথা জানা গেছে। একসময় যে ফুল ছিল হাতের নাগালে, তা এখন অনেকের কাছে বাড়তি খরচ ও অনিশ্চয়তার নাম।
কাঁচড়াহাটি এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা নিতাই মণ্ডলের মনে পড়ে ছোটবেলার বর্ষার দিনগুলোর কথা। গ্রামের পুকুর ও বিলে ফুটে থাকত পদ্ম। পূজার সময় বাড়ির লোকজন নিজেরাই জলাশয় থেকে ফুল তুলে আনতেন। ফুল সংগ্রহের জন্য বাজারে যেতে হতো না, দূরের এলাকার ওপরও নির্ভর করতে হতো না। এখন সেই জলাশয়গুলোর অনেকটিতেই আর পদ্ম দেখা যায় না। তার ভাষ্য, আগের মতো মিঠাপানির অনেক জলাশয় নেই। এজন্য পদ্মফুলও আর দেখা যায় না।
শ্যামনগরের আরেক পূজারি খগেন চক্রবর্তীর উদ্বেগ আরও গভীর। তার আশঙ্কা, পদ্মের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো নিজেদের এলাকার পদ্মে ভরা জলাশয়ের কথা শুধু বড়দের মুখে শুনবে। প্রকৃতির সঙ্গে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের যে স্বাভাবিক যোগ ছিল, তা হারিয়ে যাবে ধীরে ধীরে।
‘একটি ধর্মীয় আচার পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ফুল যদি নিজের এলাকার প্রকৃতি থেকে আর পাওয়া না যায়, তাহলে বিষয়টি ভাবনার। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো বই বা ছবি দেখে জানবে, এ এলাকায় একসময় প্রচুর পদ্ম ফুটত’— যোগ করলেন তিনি।
বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদের শ্যামনগর উপজেলা শাখার সদস্য সচিব উৎপল মণ্ডল জানালেন, আগে মানুষ নিজেরাই বিভিন্ন ফুল সংগ্রহ করতেন। এখন অনেক ফুল বাজার থেকে কিনতে হয়। পদ্মের সংকট বেশি। দূর থেকে ফুল আনতে খরচ বাড়ে, আবার প্রয়োজনের সময় ফুল পাওয়া যাবে কি না, সেই নিশ্চয়তাও নেই। তার মতে, পদ্মের আবাসস্থল রক্ষায় স্থানীয় উদ্যোগ ও জনসচেতনতা জরুরি।
শ্যামনগরের উপকূলীয় জীবন দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার চাপে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, জলোচ্ছ্বাসের লবণাক্ত পানি ঢুকে অনেক জলাশয়ের পরিবেশ বদলে যাওয়ায় পদ্মের বিস্তার কমছে। তবে এ সংকটের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি ভূমিকা রয়েছে জলাশয় ভরাট, দখল ও মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেরও।
শ্যামনগর মহসিন ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. প্রতাপ কুমার রায়ের মতে, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জলাশয় ভরাট ও দখল, পানির স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পদ্মের মতো জলজ উদ্ভিদের উপযোগী আবাসস্থল কমে যেতে পারে। অপরিকল্পিতভাবে লোনা পানিতে মাছ চাষ এবং জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণেও মিঠাপানির জলাশয়ের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বলছিলেন, ‘শুধু ধর্মীয় আচার নয়, পদ্মের মতো দেশীয় জলজ উদ্ভিদের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণ এবং স্থানীয়ভাবে এর আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’



