কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসবের সমাপ্তি শ্রীমঙ্গলে

ছবি: আগামীর সময়
কারও ধর্মীয় পরিচয় হিন্দু, কারও মুসলিম। কিন্তু গানের আসরে নেই ধর্মের কোনো বিভেদ। সবাই বসেছেন একই সারিতে। সবার পরনে সাদা রঙের নানা নকশার পোশাক। তাজা গাঁদা ফুলের মালা ও বাহারি ফুলে সাজানো মঞ্চের সামনে বসেছেন শিল্পীরা। তাদের সামনে রয়েছে ঢোল, করতাল, বাঁশি ও হারমোনিয়ামসহ নানা বাদ্যযন্ত্র। শিল্পীদের কণ্ঠে একের পর এক পরিবেশিত হচ্ছে কবীর ও লালনের মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতির গান। গানের সুরে যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে ধর্ম-বর্ণের সব বিভেদ।
গত ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে শুরু হয়েছিল দেশব্যাপী কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসব। দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও এলাকা ঘুরে গতকাল শুক্রবার রাতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে সমাপনী আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এই উৎসব।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় লালন বিশ্বসংঘ এ উৎসবের আয়োজন করে। শুক্রবার রাতে শ্রীমঙ্গল শহরের ভানুগাছ সড়কে জেলা পরিষদ অডিটরিয়ামে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী ও সিলেটে নিযুক্ত ভারতের সহকারী হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাশ। এতে সভাপতিত্ব করেন লালন বিশ্বসংঘের প্রধান নির্বাহী ও কবীর-লালন গবেষক আবেদল মান্নান।
উদ্বোধনী বক্তব্যে অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ বলেন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সত্য ইতিহাসবোধের শিক্ষা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। তরুণদের ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে নৈরাজ্য ও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা রুখতে সাংস্কৃতিক জাগরণ প্রয়োজন। কবীর ও লালন ফকিরের কালজয়ী দর্শন অনুসরণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, তারেক রহমানের সরকার সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। হারিয়ে যেতে বসা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণেও কাজ করছে। কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসব তারই একটি উদাহরণ। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে দেশব্যাপী এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অনিরুদ্ধ দাশ বলেন, কবীর ও লালনের জীবনদর্শন ও বাণী থেকে মানবতার শিক্ষা পাওয়া যায়। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে মানবতা, সহানুভূতি ও আধ্যাত্মিক চিন্তার এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে।
সভাপতির বক্তব্যে আবেদল মান্নান বলেন, কবীর ও লালন ফকিরের দর্শন, মানবতাবাদী চিন্তা ও জীবনবোধ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাঁদের বাণী ও আদর্শ চর্চার মাধ্যমে সমাজে মানবিক মূল্যবোধ, সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিক চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা থেকে আসা কবীর-লালন মিউজিক্যাল মিশনের শিল্পীরা ভাবসংগীত পরিবেশন করেন। পাশাপাশি সিলেট বিভাগের বিভিন্ন চা-বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী কবীরপন্থী, রবিদাস ও পাইনকা সম্প্রদায়ের শিল্পীরা সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন।
আয়োজকেরা জানান, গত ১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে এ উৎসবের যাত্রা শুরু হয়। এরপর বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, শেরপুর ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও এলাকায় উৎসবের আয়োজন করা হয়। ধারাবাহিক আয়োজনের শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হয় শ্রীমঙ্গলে।




