‘নাই আর অভাব’ রোগে আক্রান্ত ঈশ্বরদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

ঈশ্বরদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
হাসপাতলে নেই জেনারেটর, পর্যাপ্ত চিকিৎসক, সিজারিয়ান কার্যক্রম বন্ধ, নেই ইসিজি টেকনিশিয়ান, অভাব ডেঙ্গুকিটের, স্যালাইন সংকট, পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং খাবার সরবরাহসহ নানা অব্যবস্থাপনায় জরাজীর্ণ পাবনার ঈশ্বরদীর ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
প্রায় চার লাখ মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল এই প্রতিষ্ঠানটি নিজেই যেন 'নাই আর অভাব' রোগে ভুগছে।
চলতি মাসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায়ও হাসপাতালের এসব সংকট ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৪১টি চিকিৎসকের পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ২১ জন (যার মধ্যে বিশেষজ্ঞদের ৯টি পদই শূন্য)। ২৯ জন নার্সের জায়গায় রয়েছেন ২৮ জন। অন্যান্য ১০০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৬৬ জন। অর্থাৎ মোট ১৭০টি পদের বিপরীতে পদ খালি রয়েছে ৫৫টি।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ান অপারেশনসহ প্রসূতি ও শিশু সেবা কার্যক্রম। ১০ বছর ধরে ইসিজি টেকনিশিয়ান নেই। বায়োকেমিক্যাল এনালাইজার ও আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। ডেন্টাল চেয়ারের অভাবে দেওয়া যাচ্ছে না দাঁতের চিকিৎসাও। পাশাপাশি দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও আইভি স্যালাইনের তীব্র সংকট।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, হাসপাতালে লোডশেডিং হয় অতিরিক্ত। বিকল্প জেনারেটর বা আইপিএসের ব্যবস্থা না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে চিকিৎসক ও নার্সদের বাধ্য হয়ে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট বা টর্চ জ্বালিয়ে রোগীদের জরুরি সেবা দিতে হয়।
কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ভাষ্য, হাসপাতালটিতে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৬০০ থেকে ৭০০ জন এবং জরুরি বিভাগে ২০০ থেকে ২৫০ জন রোগীর বিশাল চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান ঘোরে না। অসুস্থ শিশুদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের করিডর। অতিরিক্ত চাপের কারণে মাঝে মাঝে রোগীদের স্বজনদের সঙ্গে চিকিৎসকদের কথাকাটাকাটিও হতে দেখা যায়।
রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের বেডের তুলনায় ভর্তি রোগী বেশি হওয়ার প্রায়ই মেঝেতে নিতে হয় চিকিৎসাসেবা। তবে পর্যাপ্ত বেডশিট ও বালিশ না থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার অভাবে ব্যবহার অনুপযোগী হাসপাতালের অধিকাংশ টয়লেট। এদিকে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের দেওয়া খাবারের মান নিয়ে উঠেছে চরম অসন্তোষ। দেয়ালের সরকারি চার্টে উন্নতমানের পাউরুটি, ডিম, কলা, রুই মাছ, দুধ, মিষ্টি, খাসির মাংসসহ সুষম খাবারের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তা মেলে না। সপ্তাহে দু'বেলা খাসির মাংস দেওয়ার নিয়ম থাকলেও দেওয়া হয় মাত্র একবেলা (দুপুরে)। রাতে দেওয়া হয় বয়লার মুরগি। সপ্তাহে দুদিন রুই দেওয়া হলেও সেটাও পরিমাণে কম।
এ বিষয়ে খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আসিব জানালেন, ‘খাসির মাংসের সরকারি দর কেজিপ্রতি ৭৫০ টাকা ধরা আছে, কিন্তু বাজারে এখন ১২০০ টাকা। তাই খরচ পোষাতে একবেলা বয়লার মুরগি দিতে হচ্ছে।’
সবচেয়ে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হাসপাতাল চত্বরে বেসরকারি ক্লিনিক ও ফার্মেসির দালালদের উৎপাত। অনেক সময় চিকিৎসকরা সরকারি ওষুধ থাকা সত্ত্বেও রোগীদের বাইরের ফার্মেসি ও নির্দিষ্ট ক্লিনিকে টেস্ট করাতে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি নিয়মে ২০০ টাকা ফিতে বৈকালিক সেবা চালু হলেও, কয়েক মাস আগে একটি ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়ানোর পর থেকে ওই সেবাটিও বন্ধ রয়েছে। এতে আরও বেশি বিপাকে পড়েছেন সাধারণ রোগীরা। তবে দফায় দফায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সভাকক্ষে ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা করেও এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না।
সার্বিক বিষয় নিয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন পাল জানালেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে সাধারণ মানুষ যেন কোনোভাবেই ভোগান্তির শিকার না হয় সেজন্য ফার্মেসির সিন্ডিকেট, ওষুধের অতিরিক্ত দাম ও দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ অভিযান) পরিচালনা উদ্যোগ নিয়েছেন তারা।
তার দাবি, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে সেবা দিতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে তাদের। প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠিও পাঠিয়েছেন তারা। বিদ্যমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।



