‘শান্ত’ রংপুরে ৭ দিনে ৬ খুন
- চার খুন ঘিরে তোলপাড়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রংপুরে একই পরিবারে চার খুনের রেশ এখনো কাটেনি। আলোচিত এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে প্রতিদিনই চলছে আন্দোলন। তারপরও থেমে নেই হত্যাকাণ্ড। গত শুক্রবার রাতে এক অটোরিকশাচালককে গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত সাত দিনে ছয় খুনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ও রংপুরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সচেতন মহল।
আসামির পক্ষে লড়বেন না আইনজীবীরা: চার খুনের ঘটনায় আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই না করার ঘোষণা দিয়েছে রংপুর আইনজীবী সমিতি। গতকাল শনিবার সকালে সমিতি ভবনে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাব উদ্দিন। তিনি বলেছেন, ‘সমিতির পক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আইনগত সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত পুলিশের তদন্ত কার্যক্রম সঠিক পথেই আছে বলে আমরা মনে করছি।’
এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা রকমের গুজব ও গল্প সাজিয়ে প্রচার করছেন। অনুরোধ, এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে কেউ রাজনীতি করবেন না। কোনো ধরনের গুজব ছড়াবেন না’— যোগ করেন তিনি।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি: চার খুনের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে মহানগর নাগরিক কমিটি। গতকাল দুপুরে স্থানীয় একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি জানানো হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ।
লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, একই পরিবারের সবাইকে নৃশংসভাবে খুনের ঘটনা প্রমাণ করে রংপুরসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নাজুক। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডসহ দেশে সংঘটিত প্রতিটি হত্যার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্ত প্রয়োজন।
পুলিশ ও গ্রেপ্তারদের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, আলোচিত চার খুনের ঘটনায় প্রত্যেককে গলায় গামছা বা রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
গত ২২ আগস্ট রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বাড়ির ছাদে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় শিক্ষকসহ একে একে তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনায় একই এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন তারা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবায়দুল ইসলাম বুলেট বললেন, ‘রংপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি ঘটছে এবং পুলিশ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। খুন হওয়ার পর আসামি ধরায় কোনো কৃতিত্ব নেই, যদিও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়াই তাদের প্রধান কাজ হওয়া উচিত।’
মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগের মতে, রংপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। দ্রুত পুলিশের টহল ও নজরদারি বাড়িয়ে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে চার খুনের ঘটনার সাত দিনের মাথায় গত শুক্রবার গভীর রাতে মোখলেছুর রহমান নামে এক অটোরিকশাচালকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের কাউয়াফান্দা এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। নিহত মোখলেছুর রহমান গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের নবনীদাস এলাকার মৃত হামিদুর রহমানের ছেলে।
এর আগে গত ২৩ আগস্ট রাতে রংপুর মেট্রোপলিটনের হারাগাছ থানা এলাকার চরচতুরা গ্রামের একটি নির্জন সড়ক থেকে আবু সিদ্দিক (৩৫) নামে এক যুবকের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে চাইনিজ কুড়াল উদ্ধার করেছে পুলিশ।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রশিদ বলেছেন, ‘চার খুনের ঘটনা নিয়ে সারা দেশে আলোচনা চলছে। তদন্ত চলমান থাকায় নানা ধরনের তথ্য ও বক্তব্য সামনে আসতে পারে। তবে তদন্তের ধারাবাহিকতায় প্রকৃত ঘটনা খতিয়ে দেখছি।’ এ ছাড়া বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো নিয়ে পুলিশ কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।







