প্রথম জাহাজ পৌঁছাল, প্রাণ ফিরল সেন্ট মার্টিনে

ছবি: আগামীর সময়
দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে পর্যটকদের পদচারণে মুখর হলো দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন। পর্যটকবাহী প্রথম জাহাজ এমভি বারো আউলিয়া দ্বীপের জেটিতে পৌঁছালে পর্যটকদের হাতে লাল গোলাপ তুলে দিয়ে স্বাগত জানান স্থানীয় বাসিন্দা ও হোটেলমালিকরা। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ফুল দিয়ে পর্যটকদের বরণ করে নেন তারা। দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটকদের আগমনে দ্বীপের পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। নতুন করে ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর আশাও দেখছেন তারা।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে ৮৩৭ পর্যটক নিয়ে এমভি বারো আউলিয়া সেন্ট মার্টিন জেটিঘাটে পৌঁছায়।
এর আগে সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ার বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাট থেকে দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে জাহাজটি। নানা প্রতিকূলতা ও দীর্ঘ অপেক্ষার পর নতুন পর্যটন মৌসুমে এই প্রথম পর্যটক নিয়ে কোনো জাহাজ দ্বীপে পৌঁছাল।
সেন্ট মার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজমালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, ‘নানান প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে মৌসুমের প্রথম জাহাজটি সেন্ট মার্টিনে পৌঁছেছে। প্রথম দিনেই ৮৩৭ জন পর্যটক নিয়ে এমভি বারো আউলিয়া দ্বীপে এসেছে। পর্যটকরা নির্বিঘ্নে ও সুস্থভাবে পৌঁছেছেন। তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়েছে। প্রথম দিনের এই যাত্রা আমাদের জন্য আনন্দের।
স্থানীয় হোটেলমালিক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘অবশেষে আজ দ্বীপে পর্যটকরা এসে পৌঁছেছেন। এতে আমরা খুবই আনন্দিত। তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নিয়েছি। দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের আগমনে দ্বীপের পর্যটন ব্যবসায় আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
তিনি বলেন, তাদের ব্যবসা মূলত পর্যটন মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল। বছরে মাত্র তিন থেকে চার মাস ব্যবসা করার সুযোগ পান তারা। এই কয়েক মাসের আয় দিয়েই বাকি ৮-৯ মাস পরিবারের খরচ চালাতে হয়। দীর্ঘদিন পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। পর্যটকরা আসতে শুরু করায় আবারও ব্যবসা সচল হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আবুল কালাম আজাদ আরও বলেছেন, এবারের পর্যটন মৌসুম নিয়ে তারা বেশ আশাবাদী। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার টানা সাড়ে চার মাস পর্যটকদের দ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ থাকায় ব্যবসা ভালো হওয়ার প্রত্যাশা করছেন তারা। এ জন্য আগেভাগেই হোটেল, রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে।
দিনাজপুর থেকে আসা পর্যটক হৃদয় হাসান বলেন, ‘সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে আসার জন্য কক্সবাজারে চার দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আজ দ্বীপে পৌঁছাতে পেরে খুবই আনন্দিত। আসার পথে কোনো ধরনের ঝামেলা বা ভোগান্তি হয়নি। নির্বিঘ্নে পৌঁছাতে পেরে ভালো লাগছে।
তিনি আরও বলেছেন, দ্বীপে পৌঁছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পেয়ে অপেক্ষার কষ্ট অনেকটাই ভুলে গেছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেন্ট মার্টিনে আসার অনুভূতি তার কাছে অন্য রকম।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ২৫ অক্টোবর জারি করা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াতের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন। প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি।
গত বছর পর্যটকদের জন্য দ্বীপটি সীমিত পরিসরে উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে শুধু দিনের বেলায় ভ্রমণের সুযোগ ছিল; রাতে থাকার অনুমতি ছিল না। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাত্রিযাপনের সুযোগ দেওয়া হলেও প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ হাজার পর্যটক যাওয়ার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে পর্যটক যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছিল।
এবারের সিদ্ধান্তে পর্যটকদের ভ্রমণের সময়সীমা ১৫ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে দৈনিক পর্যটকসংখ্যার সীমা ২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৫০০ করা হয়েছে। গত বছর নভেম্বর মাসে রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ থাকলেও এবার পর্যটকদের রাতযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে পরিবেশ সংরক্ষণে আগের বছরের অধিকাংশ বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। পর্যটকদের অনুমোদিত ওয়েবসাইট থেকে কিউআর কোডযুক্ত টিকিট ও ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করতে হবে। দ্বীপে পলিথিন বহন করা যাবে না এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পরিহার করতে হবে। সৈকতে রাতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দে গান বাজানো ও বারবিকিউ পার্টি নিষিদ্ধ। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইক ও অন্যান্য মোটরযান চলাচলও নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। ছেঁড়াদ্বীপে পর্যটকদের যাতায়াত এবং দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়, এমন কর্মকাণ্ডের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে।
পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় দ্বীপের পর্যটননির্ভর হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁসহ অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য ফিরবে বলে আশা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তবে পর্যটকের সংখ্যা ও ভ্রমণের সময় বাড়ানোর পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ, প্রবাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক প্রতিবেশ রক্ষায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।




