ছুটির দিনেও কমিটি এনসিটি বিদেশিদের দিতে তাড়াহুড়া

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল। ছবি: সংগৃহীত
আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার নেগোসিয়েশন চালাতে শুক্রবার সরকারি বন্ধের দিনেও কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। আর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তও এসেছে বৃহস্পতিবার অফিস সময়ের পর।
এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকারের আমলে এনসিটি বিদেশিদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়া লক্ষ করা যাচ্ছে। এমন তাড়াহুড়া ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও। আওয়ামী লীগ আমলে এই প্রকল্প বন্দরের মতামত ছাড়াই নেওয়া হয়েছে।
তাড়াহুড়া নয়, জরুরি ফাইল অনলাইনে পাঠানো হয়েছে— এমন দাবি চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব নাসির উদ্দিনের। তিনি বলেছেন, ‘এনসিটির ফাইলটি জরুরি হিসেবে আমাদের প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। শুক্রবার সেটি মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে।’
শুক্রবার ফাইল পাঠালেও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত আসার কথা ছিল গতকাল রবিবার। অনুমোদনের পরই এই কমিটি নেগোসিয়েশন শুরু করবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে।
বন্দরের দীর্ঘদিন ধরে সদস্য প্রশাসনের মতো উচ্চ পদে চাকরি করেছেন জাফর আলম। অবসরে গিয়েছেন কয়েক বছর আগে। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হতাশার সুরে বললেন, “কর্তার ইচ্ছাই কর্ম। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমাদের মতামত না নিয়েই সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এরকম প্রকল্প চাপিয়ে দেওয়া ‘গরিবের বউ সবার ভাবির মতোই’। আরব আমিরাতে কাজ করেন প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী। তাদের সরকারের ইচ্ছা বা আগ্রহকে গুরুত্ব না দেওয়া আমাদের মতো দেশের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এখন বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে প্রশ্ন
দেখা দেওয়ায় স্বচ্ছতার জন্য উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে বিষয়টি ফয়সালা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে আমার মতামত হলো, বন্দরের পুরনো অংশ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট না করে নতুন বন্দর নির্মাণের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করা যেতে পারে।”
দেশের প্রধান সামুদ্রিক বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক ও একক বৃহত্তম আয়ের খাত হলো নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, যা সংক্ষেপে এনসিটি, যা বন্দরের নিজস্ব টাকায় তৈরি। কি গ্যান্ট্রিক্রেনের মতো অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতিও স্থাপন করা হয়েছে এতে। এরকম লাভজনক ‘সোনার হরিণ’ কেন, কার স্বার্থে, কীসের জন্য বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করল— এ নিয়ে বন্দর ব্যবহারকারী, দেশের আমদানি-রপ্তানিকারকদের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন-আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
বন্দরের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেছেন, ফাইল জরুরি হলেও সেই আদেশ তৈরি করতে বন্দর ভবনে এসেছেন কর্মকর্তারা। কমিটি গঠন, আদেশে স্বাক্ষর, ফাইল নথিভুক্ত করেছেন। এই কাজ করার জন্য তারা ওভারটাইমও নেবেন। বিশেষ কাউকে সুবিধা দিতে বন্দরের এই বিশেষ দক্ষতা অন্য সব জরুরি ফাইলের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে দেশ-জাতি অনেক উপকৃত হতো।
পিপিপি গাইডলাইন অনুযায়ী, নেগোসিয়েশনের সাত সদস্যের কমিটিতে আহ্বায়ক চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ। আর সদস্য সচিব হলেন বন্দর পরিচালক (পরিবহন)। কমিটিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) তিনজন সদস্য, কনট্রাকটিং অথরিটির পক্ষে একজন মনোনীত সদস্য আছেন। এ কমিটিই বন্দরের পক্ষে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বোঝাপড়া করবে।
পিপিপি ও জিটুজি ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবের কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন করবে এই কমিটি। প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের বিপরীতে ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দর কর্তৃপক্ষকে কত ডলার বা টাকা রয়্যালটি দেবে এবং বন্দরের আয়ের অংশীদারত্ব কত হবে— কনসেশন চুক্তির মেয়াদসহ বিভিন্ন বিষয় দরকষাকষির মাধ্যমে চূড়ান্ত করবে কমিটি। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তই প্রকাশ করা যাবে না; কারণ এটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট।
এ সাত সদস্যের কমিটি কতটা সক্ষম, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো আন্তর্জাতিক জায়ান্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন চুক্তি এই কমিটি কীভাবে করবে? এতে বন্দর-দেশের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে— এমন জোর গুঞ্জন চলছে।
বিষয়টি জানতে কমিটির আহ্বায়ক কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহকে ফোন দিলেও সাড়া মেলেনি। একইভাবে ফোনে সাড়া পাওয়া যায়নি চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মুনিরুজ্জামানেরও। এসএমএস দিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় কারিগরি ও আইনি এবং ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজর (লেনদেন উপদেষ্টা) হিসেবে পরামর্শ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি বা আরএফপি তৈরি করার মূল কাজটি তারা তদারকি করেছে।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, আগে থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রকল্পে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এবং নিবিড়ভাবে কাজ করছে আইএফসি। ফলে একই আইএফসি ডিপি ওয়ার্ল্ডের বদলে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা সুরক্ষা হবে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।




