জেলেদের আকুতি
বন খুলবে, মাছ ধরব কিন্তু চাঁদা দেব কী দিয়ে?

নৌকা টেকসই করতে আলকাতরা দিচ্ছেন জেলে ইসরাফিল মোল্লা। শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন মুন্সীগঞ্জের হরিনগর এলাকায়
দুপুরের কড়া রোদ। চুনকুড়ি নদীর পাড়ে নৌকার গায়ে আলকাতরা লাগাচ্ছিলেন ইসরাফিল মোল্লা (৫৫)। রোদের তাপে ঘামে ভিজে গেছে শরীর। তবু কাজ থামেনি। তার একটু দূরেই নৌকার কাঠে হাতুড়ির টুংটাং শব্দ। কেউ নৌকার পাটাতন মেরামত করছেন, কেউ জাল সেলাই করছেন। রোদে পোড়া শরীর নিয়ে সুন্দরবনসংলগ্ন এসব মানুষ যেন নতুন করে জীবনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে সুন্দরবনসংলগ্ন চুনকুড়ি নদীর পাড়ে সরেজমিনে দেখা যায়, ১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবন খুলে দেওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন জেলে-বাওয়ালিরা। তিন মাস ধরে পড়ে থাকা নৌকা মেরামত, জাল সেলাই ও নৌকার গায়ে আলকাতরা লাগানোর কাজ চলছে। দীর্ঘদিন পর বনে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি তাদের কথায় উঠে আসে ঋণের চাপ ও বনদস্যুদের চাঁদা নিয়ে আতঙ্ক।
দীর্ঘ তিন মাস ধরে তাদের নৌকা পড়েছিল। বনে যাওয়া বন্ধ, মাছ-কাঁকড়া ধরা বন্ধ। আয় না থাকায় সংসার চালাতে অনেককেই ধার করতে হয়েছে। এখন সেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই নৌকা-জাল মেরামত করছেন তারা। কারণ আগামী ১ সেপ্টেম্বর খুলছে সুন্দরবনের দুয়ার।
তাই এখন শ্যামনগরের উপকূলের বিভিন্ন নদী-খালপাড়ে অন্য রকম ব্যস্ততা। দুপুরের তীব্র রোদেও থামছে না কাজ। রোদে পোড়া শরীর নিয়ে জেলেরা নৌকা মেরামত করছেন, জাল সেলাই করছেন। কেউ আলকাতরা লাগাচ্ছেন, কেউ কাঠে পেরেক ঠুকছেন। তাদের চোখে এখন সুন্দরবন। সেখানে গেলে মাছ-কাঁকড়া মিলবে। মিলবে আয়। সেই আয় দিয়ে শোধ করতে হবে তিন মাসের ধারদেনা, চালাতে হবে সংসার, মেটাতে হবে নৌকা ও জাল মেরামতের খরচ।
কারও স্বপ্ন, ঋণের বোঝা একটু হালকা হবে। কারও আশা, সন্তানের মুখে আবার ভালো খাবার তুলে দিতে পারবেন। কেউ চান সংসারে একটু স্বস্তি ফিরুক। তবু সেই স্বপ্নের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ভয়। বন খুলবে। তারা বনে যাবেন। নদীতে জাল ফেলবেন, কাঁকড়া ধরবেন। কিন্তু ফিরে আসার সময় সঙ্গে কতটা আয় থাকবে, আর কতটা চলে যাবে চাঁদার পেছনে- সেই অনিশ্চয়তা তাদের পিছু ছাড়ছে না।
নৌকায় আলকাতরা লাগানোর কাজে ব্যস্ত থাকা জেলে ইসরাফিলের চোখে তাই আশার ঝিলিক। কাজের ফাঁকে তিনি বললেন, ‘১ তারিখ বন (সুন্দরবন) খুলবে। বনে যাব, মাছ-কাঁকড়া ধরব। ধারদেনা শোধ করব। ছেলেমেয়েদের কিছু শখ-আহ্লাদও পূরণ করব।’
কথার মাঝেই যেন সেই আশায় ছায়া পড়ে। একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ইসরাফিল মোল্লা বলে, ‘কিন্তু ভয়ও আছে। যে টাকা কামাই করব, তা দিয়ে ঋণ শোধ করব, নাকি বনদস্যুদের চাঁদা দেব- আল্লাহ জানেন।’
ইসরাফিল মোল্লা নৌকার গায়ে আলকাতরা লাগাতে লাগাতে যে প্রশ্নটি তুলেছেন, সেটিই যেন উপকূলের অনেক জেলের প্রশ্ন- ‘বন খুলবে, আমরা যাব। মাছ ধরব। কিন্তু কামাইটা শেষ পর্যন্ত কার ঘরে যাবে- আমাদের নাকি বনদস্যুদের?
ইসরাফিলের এই কথার মধ্যেই যেন সুন্দরবনসংলগ্ন শ্যামনগরের জেলে-বাওয়ালিদের বর্তমান জীবনের টানাপড়েনটা ধরা পড়ে। একদিকে তিন মাসের আয়হীনতার ঋণ, অন্যদিকে বনে গিয়ে নিরাপদে ফিরে আসার অনিশ্চয়তা।
মাছের প্রজনন মৌসুম ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জুন, জুলাই ও আগস্ট- এই তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ এবং মাছ-কাঁকড়া আহরণ বন্ধ থাকে। এ সময়ে সুন্দরবননির্ভর হাজারো মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন। কারও নৌকা পড়ে থাকে খালে, কারও জাল শুকিয়ে যায় উঠানে। সংসারে চাল-ডাল ফুরিয়ে এলে ধার করতে হয় তাদের।
টানা তিন মাস পর সেই বন্ধ দরজা খুলছে। তাই সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন নদী-খালপাড়ের জেলেপল্লীগুলোতে এখন ব্যস্ততা। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেও আছে দুশ্চিন্তা- বনে গিয়ে এবার কতটা আয় হবে, কতটা ঋণ শোধ হবে, আর নিরাপদেই ফিরবেন তো? এমন প্রশ্ন এ অঞ্চলের সুন্দরবননির্ভর বনজীবীদের।
সুন্দরবনসংলগ্ন মুন্সীগঞ্জের হরিনগর গ্রামের জেলে ইসরাফিল মোল্লা বলেন, ‘তিন মাস তো ঘরে বসে থাকতে হয়েছে। সংসার চালানোর জন্য অনেকেই সুদে টাকা নিয়েছে। আমিও নিয়েছি। এখন আবার সেই টাকা দিয়ে নৌকা আর জাল ঠিক করছি।’
ইসরাফিলের পাশে কাজ করছিলেন আরও কয়েকজন জেলে। কারও হাতে হাতুড়ি, কারও হাতে কাঠের টুকরা, কেউ নৌকার গায়ে আলকাতরা লাগাচ্ছেন। দুপুরের রোদে তাদের শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। তবু বিশ্রামের সময় নেই। নৌকা ঠিক না হলে বনে যাওয়া যাবে না, জাল ঠিক না হলে মাছ ধরা যাবে না।
বুড়িগোয়ালিনীর দাঁতিনাখালী গ্রামের জেলে বাসার গাজীরও একই অবস্থা। তিন মাস সংসার চালাতে গিয়ে মহাজনের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে তার। বাসার গাজী বললেন, ‘বাদা (সুন্দরবন) খুললে কামাই করে আগে ঋণ শোধ করব। কিন্তু বনদস্যুদের চাঁদা দিতে হলে ঋণ শোধ হবে কীভাবে?’
প্রশ্নটি শুধু বাসার গাজীর নয়। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল অনেক জেলেরই একই প্রশ্ন। জাহাঙ্গীর হোসেন, আমিনুর গাজী, শ্যামল মণ্ডল, অরুন মণ্ডল ও আনসার আলীসহ কয়েকজন জেলে বলেন, গত তিন মাস আগে বন খোলা থাকলেও তাদের বনদস্যুদের চাঁদা দিয়ে ‘স্লিপথ নিয়ে বনে ঢুকতে হয়েছে। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে বনদস্যু নির্মূলের আশ্বাস দেওয়া হলেও তারা কার্যকর অভিযান দেখতে পাননি। তাই বনে যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেও তাদের মনে ভয়- মাছ ধরতে গিয়ে নিরাপদে ফিরতে পারবেন তো?
সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খালে প্রায় ৩৫ বছর ধরে মাছ-কাঁকড়া আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ষাটোর্ধ্ব আমিনুর গাজী। সুন্দরবনসংলগ্ন চুনকুড়ি নদীর পাশে মথুরাপুর গ্রামের বাড়ির সামনে নৌকার পাটাতনে বসে জাল গোটাচ্ছিলেন তিনি। আমিনুর গাজী বলেন, ‘বনে গিয়ে কষ্ট করে মাছ-কাঁকড়া ধরব। যদি তার পরও চাঁদা দিতে হয়, তাহলে আমাদের লাভ কী?’
কথাটা বলেই আবার জালের দিকে মন দেন তিনি। সামনে অনেক কাজ। জাল ঠিক করতে হবে, নৌকা মেরামত করতে হবে। তারপর বনে যেতে হবে। কারণ সুন্দরবন ছাড়া তার মতো মানুষের জীবিকার আর কোনো সহজ পথ নেই। শুধু জেলে ইসরাফিল মোল্লা, বাসার গাজী বা আমিনুর গাজী নন, সুন্দরবনকে ঘিরে যাদের জীবিকা, তারাও তিন মাস ধরে অপেক্ষায় ছিলেন।
মুন্সীগঞ্জ এলাকার পর্যটকবাহী ট্রলারের মালিক নূর ইসলাম বলেন, তিন মাস ট্রলার বসে থাকায় লোনা পানিতে ট্রলারের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেটি মেরামত করতে তাকে সমিতি থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। নূর ইসলাম বলেন, ‘বন খুললে যে টাকা আয় হবে, সেই টাকা দিয়ে সমিতির ঋণ শোধ করতে হবে। তারপর সংসার চালাতে হবে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে চলাই কঠিন হয়ে যাবে।’
তিন মাসের আয়হীনতার পর সুন্দরবন খুলছে। কিন্তু বনের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনের সব সংকটের দরজা বন্ধ হচ্ছে না। বরং শুরু হবে ঋণ শোধ, নৌকা-জাল মেরামত আর সংসারের খরচ জোগানোর নতুন লড়াই।
জেলেদের আরেকটি অভিযোগ সুন্দরবনের অভয়ারণ্য নিয়ে। তাদের ভাষ্য, সুন্দরবনের বড় একটি অংশ অভয়ারণ্য হিসেবে সব সময় বন্ধ থাকে। ফলে বৈধভাবে মাছ-কাঁকড়া আহরণের সুযোগ সীমিত। তাদের দাবি, মাছ-কাঁকড়া আহরণের জন্য সুন্দরবনের অন্তত ৬০ শতাংশ এলাকা উন্মুক্ত করা হোক।
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময়ে অসাধু কিছু জেলে অভয়ারণ্য এলাকায় ঢুকে বিষ দিয়ে মাছ শিকার ও ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করেন। তাদের মতে, বৈধভাবে মাছ ধরার সুযোগ বাড়ানো গেলে একদিকে বনজীবীদের জীবিকা সহজ হবে, অন্যদিকে অভয়ারণ্যে অবৈধভাবে প্রবেশের প্রবণতাও কমতে পারে।
তবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণী রক্ষায় অভয়ারণ্য এলাকায় প্রবেশ ও শিকার বন্ধ রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন স্থানীয় পরিবেশ কর্মীরা। স্থানীয় পরিবেশকর্মী পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, ‘সুন্দরবন যেমন উপকূলের মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন, তেমনি এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিবেশ। তাই জেলেদের জীবিকা ও বনের জীববৈচিত্র্য- দুটিই বিবেচনায় নিতে হবে। অভয়ারণ্য এলাকায় মাছ ধরা বা বন্য প্রাণী শিকার কোনোভাবেই অনুমোদন করা উচিত নয়। একই সঙ্গে বৈধভাবে মাছ-কাঁকড়া আহরণের সুযোগ, জেলেদের নিরাপত্তা এবং বনদস্যুদের চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। জেলেরা যাতে নিরাপদে ও নিয়ম মেনে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।’
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে জলভাগের পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার; যা পুরো সুন্দরবনের আয়তনের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ। সুন্দরবনের জলভাগে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায়। জুন থেকে আগস্ট- এই তিন মাস প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনের নদী ও খালে থাকা বেশির ভাগ মাছ ডিম ছাড়ে। এ কারণে গত ১ জুন থেকে তিন মাসের জন্য জেলে ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বন বিভাগ। মঙ্গলবার থেকে সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে।
পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনে সম্পদ আহরণের জন্য ২ হাজার ৮৪৮ নৌকা ও ট্রলারকে বোর্ড লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) দেওয়া হয়। এসব নৌযানের মাধ্যমে প্রতিবছর আট থেকে দশ হাজার জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়াল সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ করেন। এ ছাড়া সুন্দরবনের ১টি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ হাজারেরও বেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন।
শ্যামনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগরে নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ২২ হাজার ২২৫ জন। অবশ্য স্থানীয় বনজীবীরা বলছেন, শ্যামনগরে জেলেদের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মশিউর রহমান বলেন, সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, মৎস্য সম্পদেরও আধার। ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে ও পর্যটকদের সুন্দরবনে ঢোকার পাস (অনুমতি) দেওয়া হবে। নির্ধারিত ফরেস্ট স্টেশনগুলোকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এ জন্য আগে থেকে জেলে-বাওয়ালিরাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন।







