প্রসূতি ও জরুরি রোগীর জন্য মরণফাঁদ পাবনার চরাঞ্চল

ছবিঃ আগামীর সময়
পাবনার সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা গ্রাম জোতকাকুড়িয়া যেন বাংলাদেশের মানচিত্রে এক অদৃশ্য দ্বীপ। শুকিয়ে যাওয়া পদ্মার বুক জুড়ে ধূ ধূ বালুচর আর হাঁটুজলের অনিশ্চিত ভূখণ্ড পেরিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটলেই দেখা মেলে এই জনপদের। বর্ষায় নৌকার ভরসা থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে এই পথ যেন নিঃশব্দ নির্বাসন। তখন কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে মুমূর্ষু রোগী, সবার একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় ঘোড়ার গাড়ি।
শুধু জোতকাকুড়িয়া এলাকা নয়, পাবনা সদর, সুজানগর ও বেড়া উপজেলার পদ্মা-যমুনা বেষ্টিত বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এমন বিচ্ছিন্নতার মধ্যে বাস করে অন্তত দুই লাখ মানুষ। আধুনিকতার গতি যেখানে শহরে ছুটে চলে বিদ্যুতের মতো, সেখানে এই জনপদে জীবন থেমে আছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অভাবে। দুর্গম যোগাযোগ, চিকিৎসক সংকট আর কার্যকর সেবাকেন্দ্রের অভাবে নুন্যতম স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত পদ্মা যমুনা চরাঞ্চলের এই মানুষেরা। সব মিলিয়ে এখানে অসুস্থতা মানেই এক দীর্ঘ, অনিশ্চিত লড়াই।
সাধারণ জ্বর-সর্দির চিকিৎসাই যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানে হৃদরোগ, বড় দুর্ঘটনা কিংবা মাতৃত্বকালীন জটিলতায় চিকিৎসাপ্রাপ্তি চরবাসীর কাছে যেন ‘সোনার হরিণ’। নদীর ভাঙাগড়ার সঙ্গে যাদের আজন্ম সখ্য, তাদের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন বৈষম্য আর বঞ্চনার এক অনবরত কাহিনি।
সরেজমিনে বিভিন্ন চরে ঘুরে দেখা যায়, অসুস্থতা এখানে কেবল শারীরিক কষ্ট নয়, এটি এক গভীর আতঙ্ক। ১৫ বছরের প্রতিবন্ধী তানিয়া নিয়মিত পুনর্বাসন চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও সেই সুযোগ তার নাগালের বাইরে। একইভাবে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত সত্তরোর্ধ্ব আক্কাস বিশ্বাসের মতো মানুষদের জন্য হাসপাতালে যাওয়া মানেই এক কঠিন অভিযান। পথের দুর্ভোগ আর খরচের ভার মিলিয়ে চিকিৎসা অনেক সময় মাঝপথেই থেমে যায়।
সাপে কাটা বা দুর্ঘটনার মতো জরুরি মুহূর্তে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অনেক সময় ফুরিয়ে যায় চরের মানুষের আয়ু। নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া তাদের আর কোনো পথ থাকে না।
তানিয়ার বাবা কৃষক আব্দুল মান্নান জানান, শহরের বাচ্চারা কত চিকিৎসা পায়। হয়তো সঠিক চিকিৎসা তার মেয়েটাও হয়তো ভালো থাকতে পারত। কিন্তু তার পক্ষে প্রতিদিন ৭০০ টাকা খরচ করে এত দূর যাওয়া সম্ভব না।
চরাঞ্চলে জরুরি চিকিৎসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে প্রসূতি মায়েদের জন্য এই দুর্ভোগ হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। দীর্ঘ পথ, অনিরাপদ যাতায়াত আর তীব্র ঝাঁকুনির কারণে অনেক সময় গর্ভেই ঝরে যায় অনাগত প্রাণ।
তেমনই এক নিদারুণ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন জোতকাকুড়িয়া গ্রামের সুজন বিশ্বাস। সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারায় গত বছর হারিয়েছেন অনাগত সন্তান। এবার স্ত্রীর প্রসবের তারিখ এই মাসের শেষে। তাই কোনো ঝুঁকি না নিয়ে আগেই তাকে নদীর ওপারে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
একইভাবে সোবহান বিশ্বাস স্মৃতিচারণ করে জানানা, দুই নাতনির জন্মের সময় রাতে ব্যথা উঠলে কোনো উপায় ছিল না। পুরো জীবনটাই যেন তখন আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া। একবার ভাইয়ের বউয়ের প্রসব বেদনা উঠলে ঘরের কপাট খুলে, দুই পাশে বাঁশ ও রশি বেঁধে কাঁধে নিয়ে দুই ঘণ্টা ধরে নদী পার করেছেন।
চর মধুপুরের প্রবীণ বাসিন্দা আফতাব মিয়া জানান, তার ৬৫ বছরের জীবনে অন্তত ১০টি শিশুকে সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারার কারণে মারা যেতে দেখেছেন। এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি একটি করে ভেঙে পড়া পরিবারের গল্প।
কাগজে-কলমে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর দাবি থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। অধিকাংশ এলাকায় সচল কমিউনিটি ক্লিনিক নেই, আর যেখানে আছে সেগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। স্থানীয় বরাদ্দেও রয়েছে বৈষম্যের অভিযোগ।
ভাঁড়ারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ খান আক্ষেপ করে বলেছেন, নীতিনির্ধারকদের কাছে চরের মানুষ যেন অদৃশ্য। বারবার বলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ পাননি।
বেড়া উপজেলার যমুনা তীরবর্তী চরগুলোতেও একই চিত্র। হাটুরিয়া-নাকালিয়া, নতুন ভারেঙ্গা ও পুরান ভারেঙ্গা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় এক লাখ মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নদীপথের খেয়া। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা আর অবকাঠামোগত দুর্বলতায় আধুনিক নাগরিক সুবিধা এখানকার মানুষের কাছে এখনো অধরা।
পুরান ভারেঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান আবু দাউদ জানান, নামমাত্র কয়েকটি চিকিৎসাকেন্দ্র থাকলেও সেখানে নেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা দক্ষ জনবল। এমনকি জরুরি সেবার জন্য দেওয়া নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটিও অকেজো হয়ে পড়ে আছে। ইঞ্জিন পর্যন্ত চুরি হয়ে গেছে।
পাবনার সিভিল সার্জন ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ভৌগোলিক প্রতিকূলতার প্রতিবন্ধকতা কাটাতে স্বাস্থ্যনীতিতে চরাঞ্চলের জন্য আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন। দুর্গম এলাকায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম পাঠানো গেলে অনেক সমস্যা কমানো সম্ভব।

