ঈশ্বরদীর পাকশী রেলওয়ে হাসপাতালে সেবা বন্ধ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় রোগীর ভিড়ে ঠাঁই হতো না পাবনার ঈশ্বরদীর পাকশী রেলওয়ে হাসপাতালে। শয্যা না পেয়ে মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হতো অনেককে। ১১৫ বছরের পুরনো হাসপাতালটি ছিল রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা। তবে জনবল সংকট, আধুনিক সরঞ্জামের অভাব ও অব্যবস্থাপনায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। বন্ধ রয়েছে রোগী ভর্তি ও অস্ত্রোপচার। প্রতিদিন বহির্বিভাগে আসা রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, হাসপাতালটির অধিকাংশ বিভাগ কার্যত অচল। ৮৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৮ জন। শূন্য রয়েছে ৬৮টি পদ। চিকিৎসক ও নার্স সংকটের পাশাপাশি পরীক্ষাগার, অস্ত্রোপচার কক্ষ ও অন্যান্য জরুরি সেবার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মীরও অভাব রয়েছে।
রেলওয়ের তথ্য বলছে, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯০৯ সালে পাকশী রেলওয়ে ডিসপেনসারি নামে হাসপাতালটির যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৬৩ সালে পদ্মা নদীর তীরে তিন একর জমিতে ৪৪ শয্যার নতুন ভবনে এটি স্থানান্তর করা হয়। তখন নাম দেওয়া হয় পাকশী রেলওয়ে হাসপাতাল।
একসময় পাকশী রেল বিভাগের বিস্তৃত এলাকার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এটি। হাসপাতালে ১৫০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকতেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তবে সময়ের সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের সংকট বাড়তে থাকায় সেবার পরিধি সংকুচিত হয়েছে। এখন রোগী ভর্তি পুরোপুরি বন্ধ। প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৮০-১০০ জন রোগী এলেও গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হাসপাতালে পাঁচটি চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন দুজন। তাদের একজন বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ডিএমও), যিনি সপ্তাহে তিন দিন পাকশী এবং দুদিন রাজশাহী রেলওয়ে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন। অন্য সহকারী সার্জন রাজবাড়ীসহ অন্যান্য হাসপাতালে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করায় পাকশীতে নিয়মিত চিকিৎসক পাওয়া যায় না।
নার্সের সংকটও প্রকট। ছয়জন সিনিয়র স্টাফ নার্সের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। সিস্টার ইনচার্জ, স্টোরকিপার, সিনিয়র স্যানিটারি পরিদর্শক ও প্রধান সহকারীর পদও শূন্য। টেকনোলজিস্ট, পরীক্ষাগার ও অস্ত্রোপচার কক্ষের সহকারী, অ্যাম্বুলেন্সচালক, মিডওয়াইফ, বাবুর্চি, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে লোকবল নেই।
হাসপাতালের একমাত্র সিনিয়র স্টাফ নার্স মমতাজ বেগমের ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে সীমিত জনবল দিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ছয়জনের কাজ তাকে একাই সামলাতে হয়। দায়িত্ব না থাকলেও জরুরি প্রয়োজনে তাকে হাসপাতালে ছুটে আসতে হয়।
চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের ভোগান্তিও বাড়ছে। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, হাসপাতালে গিয়ে প্রায়ই চিকিৎসক পাওয়া যায় না। তখন ফার্মাসিস্টদের কাছ থেকে ওষুধ নিতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
হাসপাতালটির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে পাকশী বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা (ডিএমও) ডা. মো. শাকিল আহমেদ বললেন, ‘ঐতিহ্যবাহী এই হাসপাতাল মাত্র এক-তৃতীয়াংশ জনবল দিয়ে চালাতে হচ্ছে।’ জনবল বাড়ানো গেলে হাসপাতালটি আবার আগের অবস্থায় ফিরবে বলে তিনি আশা করেন।
জনবল সংকটের পাশাপাশি আধুনিক সরঞ্জামের অভাবে হাসপাতালটির গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবাগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ২৮ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে অস্ত্রোপচার কক্ষ (ওটি)। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় মাতৃমঙ্গল ইউনিট বন্ধ হয়ে যায় ১৯৯০ সালে। ফলে মাতৃসেবার ক্ষেত্রেও হাসপাতালটি আগের ভূমিকা রাখতে পারছে না।
হাসপাতালের দক্ষিণ পাশে থাকা যক্ষ্মা ও ডায়রিয়া চিকিৎসার পৃথক ভবনটিও ১৯৯৬ সাল থেকে বন্ধ। দীর্ঘদিন পরিচর্যা না করায় ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বন্ধ রয়েছে ময়নাতদন্ত কক্ষও। ১৯৯০ সালের পর থেকে সেখানে আর ময়নাতদন্ত হয় না। বর্তমানে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাবনা জেলা সদরে পাঠাতে হয়। এভাবে একের পর এক সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালটির ঐতিহ্য থাকলেও কার্যকর চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়েছে।
পাকশী রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) আবু হেনা মোস্তফা কামাল মনে করেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন করা গেলে সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য সমস্যারও দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে।
তবে সংকট শুধু পাকশী হাসপাতালের নয়, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অন্যান্য হাসপাতালেও চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. আনিছুল হকের ভাষ্য, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের হাসপাতালগুলোর জন্য অন্তত ৩৭ চিকিৎসক প্রয়োজন। কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র সাতজন। ফলে একজন চিকিৎসককে একাধিক স্থানে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তার মতে, নতুন নিয়োগ ছাড়া এ সংকট নিরসন সম্ভব নয়।



