মমেক হাসপাতালে ডায়ালাইসিস
সেবা তো বহুদূর মেলে না সিরিয়াল
- ৩৩টির মধ্যে বিকল ১৩ মেশিন
- প্রতিদিন সেবাবঞ্চিত ৩৯ রোগী

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের কিডনি বিভাগে ডায়ালাইসিসের জন্য রোগীদের অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। চাহিদার তুলনায় ডায়ালাইসিস মেশিনের সংকট বহুদিন ধরেই। তার ওপর ৩৩টি মেশিনের মধ্যে বিকল ১৩টি। ফলে স্বাভাবিক সময়ে যেখানে নতুন রোগীর ডায়ালাইসিসের সিরিয়াল পেতে অপেক্ষা করতে হতো দুই মাস, মেশিন বিকলের কারণে সেই অপেক্ষার সময় হয়েছে আরও দীর্ঘ। সংকটাপন্ন অনেক রোগীও প্রয়োজনমতো সুযোগ পাচ্ছেন না ডায়ালাইসিসের।
হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানালেন, ৩৩টি মেশিন সচল থাকলে ডায়ালাইসিস সুবিধা পেতেন ৯৯ জন। একটি মেশিন দিয়ে দিনে ডায়ালাইসিস করা সম্ভব গড়ে তিনজন রোগীর। একসঙ্গে ১৩টি মেশিন বিকল থাকায় প্রতিদিন ডায়ালাইসিস সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রায় ৩৯ রোগী।
বর্তমানে সচল মেশিনগুলো দিয়ে দিনে ৫০ থেকে ৬০ জন রোগীর ডায়ালাইসিস সম্ভব হচ্ছে। বিভাগটিতে সকাল, বিকাল ও রাতে তিন শিফটে ডায়ালাইসিস দেওয়া হয়। একজন নতুন রোগীর ক্ষেত্রে সাধারণত দুই ঘণ্টা এবং জটিল রোগীর ক্ষেত্রে গড়ে চার ঘণ্টা পর্যন্ত প্রয়োজন হয় ডায়ালাইসিস। এ ছাড়া এক রোগীর ডায়ালাইসিস শেষ হওয়ার পর মেশিন আবার ব্যবহার করতে প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট সময়ের। ফলে সীমিতসংখ্যক মেশিন দিয়ে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশে দিন দিন বাড়ছে কিডনি রোগীর সংখ্যা। রোগের একপর্যায়ে অনেকেরই নিয়মিত ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয় জানিয়ে কিডনি বিভাগের চিকিৎসকদের দাবি, বেসরকারি হাসপাতালে একবার ডায়ালাইসিস করাতে যে খরচ হয়, তা অধিকাংশ রোগীর সামর্থ্যের বাইরে। ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের পাশাপাশি অনেক উচ্চবিত্ত রোগীও কম খরচে চিকিৎসা নিতে আসেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিডনি বিভাগে। হাসপাতালটিতে একবার ডায়ালাইসিস করাতে রোগীকে দিতে হয় ৮০০ টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে একই সেবার খরচ প্রায় তিন গুণ। ফলে অর্থের অভাবে অনেক রোগী বেসরকারি হাসপাতালে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে পারেন না। এ কারণে সরকারি হাসপাতালটির ওপর রোগীদের নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে।
শুধু নিয়মিত ডায়ালাইসিসের রোগীই নন, হাসপাতালের অন্যান্য বিভাগে চিকিৎসাধীন রোগীদের ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ছে মেশিন সংকটের। হৃদরোগ, দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো জটিলতায় কখনো কখনো রোগীর সাময়িক কিডনি বিকলতা হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ডায়ালাইসিস করা হলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতির জন্য কিডনি বিভাগে সাধারণত প্রস্তুত রাখা হয় দুই থেকে তিনটি মেশিন। কিন্তু বর্তমানে মেশিন সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে জরুরি ডায়ালাইসিস সেবাও। কিডনি বিভাগে নিয়মিত স্ত্রীকে নিয়ে ডায়ালাইসিস করাতে আসেন অধ্যাপক সাদেক রেজা। তার ভাষ্য, ‘এখানে চিকিৎসাব্যবস্থা খুবই ভালো। পরিবেশও ভালো। চিকিৎসক-নার্সরা আন্তরিকভাবে সেবা দেন। তবে বর্তমানে অনেক মেশিন বিকল থাকতে দেখছি। আগে একসঙ্গে এত মেশিন বিকল থাকত না।’
হাসপাতালের কিডনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. আসাদুজ্জামান রতন বলছিলেন, ‘গড়ে ১০ থেকে ১২ কিংবা ১৩টি মেশিন এখন বিকল থাকছে। এতে রোগীদের সেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরাও চিন্তিত। সমাধানে বিভাগের পক্ষ থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।’
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মাইন উদ্দিন খান জানালেন, কিডনি বিভাগের মেশিন বিকলের বিষয়টি পরিচালক মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছেন। চেষ্টা চলছে সমস্যা সমাধানের। হাসপাতালের নির্মাণাধীন নতুন ভবনে নিয়ে যাওয়া হবে কিডনি বিভাগ এবং সেখানে বর্তমানের তুলনায় আরও আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসা সুবিধা থাকবে বলেও আশাবাদী তিনি। ১০ থেকে ১১ বছর আগে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চালু হয় ডায়ালাইসিস সেবা। নতুন ভবনের পঞ্চম তলায় কিডনি বিভাগ চালুর পর ধীরে ধীরে বাড়ানো হয় মেশিনের সংখ্যা। অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সদের সেবা, কম খরচে চিকিৎসা এবং তুলনামূলক ভালো পরিবেশের কারণে অল্প সময়েই বিভাগটি হয়ে ওঠে রোগীদের আস্থার জায়গা। নতুন ভবন চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত মেশিন সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে দুর্ভোগ কমানো সম্ভব নয়।




