চোখে আলো নেই, তবু রাজুর জীবনে হাল ছাড়ার অন্ধকার নেই

১৮ বছর ধরে বাদাম–ছোলা বিক্রি করে চলছে সংসার, ভরসা শুধু মানুষের সততা
‘লাগবে বাদাম, বুট?’
বিরামপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিকেলের ব্যস্ততার মধ্যে ভেসে আসে কণ্ঠটি। সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। এক হাতে সাদা লাঠি, আর গলায় ঝোলানো লোহার রিংয়ে ছোট ছোট প্যাকেট—বাদাম, ভাজা ছোলা আর চানাচুর। কণ্ঠের মালিক রাজু আহমেদ। বয়স ৩৮।
চোখে আলো নেই। তবু অন্ধকার তার পথ আটকে রাখতে পারেনি। একজন ক্রেতা এগিয়ে এসে একটি প্যাকেট নিলেন। রাজুর হাতে টাকা দিলেন। টাকা গুনে দেখার সুযোগ নেই তার। তবু নির্দ্বিধায় পকেটে রেখে দিলেন। কারণ, প্রায় দুই দশকের এই পথচলায় মানুষের সততার ওপর তার বিশ্বাস কখনো ভাঙেনি।
রাজু বলেন, ‘আজ পর্যন্ত কেউ আমার বাদামের টাকা মেরে খায়নি। বরং ১০ টাকার বাদাম কিনে অনেকে ২০ টাকা দিয়ে যান।’
যে পথে চোখ লাগে না
রাজুর চলার পথটি তার কাছে এখন চেনা। সাদা লাঠির টোকা আর পরিচিত পরিবেশের শব্দ শুনেই তিনি বুঝে নেন কোথায় কী আছে। প্রায় ১৮ বছর ধরে এভাবেই বিরামপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে বাদাম বিক্রি করছেন।
দৃষ্টিশক্তি না থাকায় একসময় গ্রামের মানুষ তাকে কাজে নিতে চাইতেন না। অনেকে বলেছিলেন, চোখে দেখতে পান না—ব্যবসা করবেন কীভাবে? ক্রেতারা পণ্য নিয়ে টাকা না দিয়েই চলে যাবে।
কিন্তু রাজু অন্য হিসাব কষেছিলেন। মানুষের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। সেই বিশ্বাস নিয়েই শুরু করেছিলেন ছোট্ট ব্যবসা। আজও সেই বিশ্বাসই তার সবচেয়ে বড় পুঁজি।
বাদামের প্যাকেট তৈরি হয় ঘরেই
দিনের বিক্রি শেষে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন রাজু। পথে বিরামপুর শহর থেকে কিনে নেন কাঁচা বাদাম ও ছোলা। এরপর শুরু হয় পরিবারের আরেক সদস্যের কাজ।
বাড়িতে তার স্ত্রী বাদাম ও ছোলা ভেজে ১০ টাকার ছোট ছোট প্যাকেট তৈরি করেন। সেগুলো গুছিয়ে রাখা হয় লোহার রিংয়ে। পরদিন বিকেলে সেই প্যাকেটগুলো নিয়েই আবার উপজেলা পরিষদ চত্বরে হাজির হন রাজু।
এভাবেই ঘরের দুজনের শ্রমে টিকে আছে তাদের ছোট ব্যবসা।
বাদাম, ছোলা ও চানাচুর বিক্রি করে দিনে গড়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা লাভ থাকে বলে জানান রাজু। আয় খুব বেশি নয়। কিন্তু তার কাছে এই আয় শুধু টাকা নয়—এটি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার প্রতীক।
ভিক্ষার বদলে আত্মসম্মান
রাজুর বাড়ি বিরামপুর উপজেলার পশ্চিম জয়দেবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে। চার সদস্যের সংসার। আশপাশে তার মতো অনেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ আছেন। কেউ কেউ ভিক্ষাবৃত্তিতে যুক্ত হলেও রাজু সেই পথ বেছে নেননি।
কেন? রাজুর উত্তর সরল, ‘ভিক্ষা করলে মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। তার চেয়ে বাদাম বিক্রি অনেক সম্মানের। এতে সম্মানও থাকে, আবার কিছু আয়ও হয়।’
একটু থেমে তিনি যোগ করেন, ‘আমাদের পরিবারের সবাই পরিশ্রম করে। কেউ ভিক্ষায় জড়িত নয়। তাই আমিও কখনো ভিক্ষার কথা ভাবিনি।’
এই কথার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে তার জীবনদর্শন।
থেমে যাওয়া হাফেজ হওয়ার স্বপ্ন
রাজুর জীবন অবশ্য শুরু থেকেই এমন ছিল না।
ছোটবেলায় স্থানীয় একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় পড়তেন তিনি। স্বপ্ন ছিল হাফেজ হবেন। কিন্তু সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। বাবার পক্ষে পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব হয়নি।
একসময় পড়াশোনা থেমে গেল। থেমে গেল হাফেজ হওয়ার স্বপ্নও।
জীবনের আরেক বাস্তবতা তাকে ঠেলে দিল উপার্জনের পথে। দৃষ্টিশক্তি না থাকায় চাকরি বা অন্য কাজের সুযোগও ছিল সীমিত। শেষ পর্যন্ত বাদাম বিক্রিই হয়ে উঠল তার জীবিকার পথ।
খারাপ দিনে পাশে দাঁড়ান মানুষ
সব দিন অবশ্য সমান যায় না।
বৃষ্টি, ঝড় কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপজেলা পরিষদ চত্বরে মানুষের উপস্থিতি কমে গেলে রাজুর বিক্রিও কমে যায়। কোনো কোনো দিন আয় নেমে আসে অনেকটাই।
তখন তিনি কখনো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), কখনো উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কাছে যান। নিজের সমস্যার কথা জানান।
বিরামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ‘রাজু অন্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ। যেদিন তার বিক্রি কম হয়, সেদিন তিনি আমার অফিসে এলে ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করি। পাশাপাশি সরকারি যেসব সুবিধা তিনি পাওয়ার যোগ্য, সেগুলোও নিশ্চিত করার চেষ্টা করি।’
রাজুর কাছে জীবন মানে চেষ্টা
রাজুর চোখে আলো নেই। কিন্তু জীবনের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার।
তিনি জানেন, সব কাজ তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু যে কাজটি তিনি পারেন, সেটিই করতে চান। কারও দয়ার ওপর নির্ভর করে নয়—নিজের শ্রমে।
অন্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের উদ্দেশে তাই তার বার্তা, ‘ভিক্ষা না করে যার যা সামর্থ্য আছে, তা দিয়েই হালালভাবে জীবিকা নির্বাহ করা উচিত। আমরা সব কাজ করতে পারব না, কিন্তু যে কাজ পারি, সেটাই করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারি।’
বিরামপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিকেল নামলে আবার শোনা যায় সেই পরিচিত হাঁক—
‘লাগবে বাদাম, বুট?’
এই ডাক শুধু বাদাম বিক্রির ডাক নয়। এটি যেন এক মানুষের নিজের মতো করে বেঁচে থাকার ঘোষণা—চোখে না দেখেও যিনি বিশ্বাস করতে শিখেছেন মানুষকে, আর অন্ধকারের মধ্যেও খুঁজে নিয়েছেন জীবনের পথ।







