৫০ কোটি টাকার বাজারে অনিশ্চয়তা

নাটোরের ঐতিহ্যবাহী চকবৈদ্যনাথ চামড়া আড়তকে বলা হয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাঁচা চামড়ার বাজার। কোরবানির ঈদে এই আড়তে বেচাকেনা হয় উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পশুর চামড়া। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ঈদ সামনে রেখেও স্বস্তি নেই ব্যবসায়ীদের মুখে।
আড়তে ৪০-৫০ কোটি টাকার চামড়া বেচাকেনার আশা থাকলেও ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে ৬০-৭০ কোটি টাকা বকেয়া, তার ওপর হঠাৎ লবণের দাম কেজিতে বেড়েছে প্রায় ৩ টাকা। এতে নতুন বিনিয়োগ সংকট এবং লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
তাদের ভাষ্য, চলতি মৌসুমে চকবৈদ্যনাথ আড়তে বেচাকেনা হতে পারে ৪০-৫০ কোটি টাকার চামড়া। তবে ট্যানারি মালিকরা বকেয়া পরিশোধ না করায় নতুন করে চামড়া কেনা ও সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেক আড়তদারকে। এর মধ্যে নতুন করে বেড়েছে লবণের দাম। চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপকরণ হওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে উদ্বেগ।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় নাটোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম সিদ্দিকীর সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে ৬০-৭০ কোটি টাকা বকেয়া। সেই টাকা না পেয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে আবার লবণের দাম বেড়েছে। এখন অনেকেই পারছেন না প্রয়োজনীয় লবণ কিনতে।’
‘চামড়া সংরক্ষণে লবণের বিকল্প নেই। সরকার যদি দ্রুত দাম নিয়ন্ত্রণ না করে, তাহলে অনেক ব্যবসায়ী এবার চামড়া কিনতেই আগ্রহ হারাবেন’— যোগ করেন তিনি।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েকদিন আগেও ৭০ কেজির এক বস্তা লবণ বিক্রি হয়েছে প্রায় ৯০০ টাকায়। বর্তমানে একই বস্তায় গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি লবণের দাম বেড়েছে প্রায় ৩ টাকা। পাঁচ মণ ওজনের একটি ষাঁড়ের চামড়া সাধারণত হয় ২২ বর্গফুট। সরকার নির্ধারিত দামে আড়তদাররা প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়া ৪০ টাকা দরে কেনেন। সে হিসাবে একটি চামড়ার দাম পড়ে প্রায় ৮৮০ টাকা। এই চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজন হয় ১০-১২ কেজি লবণ। আগে যেখানে প্রতিটি চামড়ায় লবণের খরচ পড়ত ১৪৪ টাকার মতো। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায়
১৮০ টাকায়। এর সঙ্গে পরিবহন ও শ্রমিক খরচ যোগ করলে ঢাকায় একটি চামড়া পৌঁছাতে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ১১০ টাকা।
সরকারি নির্ধারিত দামে ঢাকার ট্যানারিগুলোতে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া বিক্রি হয় ৫৭-৬২ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি চামড়ার দাম দাঁড়ায় প্রায় ১৩০০ টাকা। সে হিসাবে একটি চামড়া বিক্রি করে আড়তদারদের লাভ থাকে মাত্র ১০০-১৫০ টাকা। লবণের দাম আরও বাড়লে সেই সামান্য লাভও থাকবে না বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
চামড়া পাচারের আশঙ্কাও করছেন ব্যবসায়ীরা। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
যদিও নাটোরের পুলিশ সুপার শরিফুল হক বলছেন, ‘নাটোর সরাসরি সীমান্তবর্তী জেলা না হওয়ায় চামড়া পাচারের সম্ভাবনা কম। তারপরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখবেন।’
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নাটোরে খামার আছে ২০ হাজার ৩৭৪টি। কোরবানির জন্য এসব খামারে প্রস্তুত করা হয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৪৩৭টি পশু। এর মধ্যে গরু ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০৫, মহিষ ২ হাজার ৫২০, ছাগল ৩ লাখ ২০ হাজার ৩৭১ এবং ভেড়া ৩৪ হাজার ৩৮টি। সব মিলিয়ে জেলায় উদ্বৃত্ত থাকছে প্রায় ২ লাখ ৮২৬টি পশু। চলতি মৌসুমে চকবৈদ্যনাথ আড়তে ১১-১২ লাখ পিস চামড়া বেচাকেনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গরু ও মহিষের চামড়া হতে পারে ৪-৫ লাখ পিস। আর ছাগল ও ভেড়ার চামড়া ৭ লাখ পিস।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম উদ্দীন আশা করছেন, জেলায় ১২টি স্থায়ী ও ১৪টি অস্থায়ী পশুর হাট বসবে। এসব হাটকে কেন্দ্র করে চামড়ার বড় বাজার গড়ে উঠবে।
তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একসময় আসত ৩০-৩২ জেলার কাঁচা চামড়া। কিন্তু বছরের পর বছর বকেয়া অর্থ না পাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন আড়ত থেকে। এখন ১৫-২০ জেলার চামড়া আসে এখানে।
ঈদের দিন বিকাল থেকেই আশপাশের জেলা ও উপজেলা থেকে কাঁচা চামড়া আসতে শুরু করে আড়তগুলোয়। এরপর রাতভর চলে লবণজাত ও সংরক্ষণের কাজ। এই মৌসুমি শিল্পকে ঘিরে কর্মসংস্থানও হয় শত শত শ্রমিক ও যুবকের।
ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন— বকেয়া টাকা, বাড়তি খরচ আর অনিশ্চয়তার চাপ সামলে চামড়ার এই ঐতিহ্যবাহী বাজার প্রাণ ফিরে পাবে কতটা?






