৫১ জনের রান্না এক হাঁড়িতে

ছবি: আগামীর সময়
একান্নবর্তী বা যৌথ পরিবারের সঙ্গে কমবেশি পরিচিত সবাই। যেখানে মা-বাবা, সন্তান, দাদা-দাদিসহ সবাই বাস করত একত্রে। যদিও এ ব্যবস্থা নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই অজানা। কেননা, সময়ের বিবর্তনে একান্নবর্তী পরিবারে ভাঙন শুরু হয়েছে বহুকাল আগেই। এখন অবশিষ্ট যদি থেকেও থাকে, তবে সেটা খুবই নগণ্য। বাস্তবে শহর বা গ্রামে এখন আর দেখা যায় না একান্নবর্তী পরিবার। সময়ের সঙ্গে যখন পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন উদাহরণ তৈরি করেছে বিনন্দপুর গ্রামের একটি পরিবার।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নের এ পরিবারটি টিকিয়ে রেখেছে ঐতিহ্যের সেই শক্ত ভিত। আট দশক ধরে ৫১ সদস্য বসবাস করছে এক ছাদের নিচে। রান্নাও হয় এক হাঁড়িতে।
৮০ বছর আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায় বাস করতেন চা শ্রমিক ভীম রূদ্রপাল। ব্রিটিশ আমলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চলে আসেন মৌলভীবাজারে। কাজ শুরু করেন ধামাই চা-বাগানে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগেই বিনন্দপুরে জমি কেনেন। সেখানেই গড়ে তোলেন স্থায়ী নিবাস। সেই থেকে শুরু একসঙ্গে থাকার গল্প।
ভীম রূদ্রপালের দুই ছেলে— মুরারি রূদ্রপাল ও কেশব রূদ্রপাল। তারাই এ পরিবারটির ধারক। তাদের ৯ ছেলে, স্ত্রী-সন্তান ও নাতি-নাতনি নিয়ে গড়ে উঠেছে ৫১ সদস্যের পরিবার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা বাস করছেন একসঙ্গে।
টিনশেডের লম্বা ঘর। প্রবেশমুখেই বড় পুকুর। পাশে সবুজে ঘেরা ফল ও সবজির বাগান। উঠানও প্রশস্ত। ৮০ বছরের পুরনো রান্নাঘর। ৫১ জনের জন্য রান্না হয় এক হাঁড়িতে। রান্নাঘরটিই যেন এ পরিবারের ঐক্যের প্রতীক।
পরিবারটির অভিভাবক এখন অনন্ত রূদ্রপাল। তিনি বললেন, ‘বাপ-দাদার সময় থেকেই আছি একসঙ্গে। রান্না হয় এক হাঁড়িতে। খাই একসঙ্গে। আলাদা হওয়ার কথা ভাবিনি কখনো। সংসারের আয়-ব্যয়ের হিসাব আমিই দেখভাল করছি। অন্যরাও নিজ কাজ দিয়ে করছে সহযোগিতা।’
পরিবারটির অর্থনৈতিক ভিতও বেশ মজবুত। ১০০ বিঘা জমি তাদের। চাষ করেন ধান, সবজি। রয়েছে পাঁচটি মাছের খামার ও গবাদিপশু। বছরে আউশ ও আমন ধান মিলিয়ে উৎপাদন হয় ৩০০-৪০০ মণ। তা দিয়ে মেটে সারা বছরের খাদ্যের চাহিদা। বাড়ির চারপাশে থাকা ৫০-৬০টি নারকেলসহ বিভিন্ন ফলদগাছ থেকেও আসে বাড়তি আয়। মাছ, সবজি কিংবা মসলার জন্য বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয় না বললেই চলে।
পরিবারের প্রবীণ সদস্য সোহাগী রূদ্রপাল জানালেন, ছেলে, বউ, নাতি-নাতনি নিয়ে আছেন ভালোই। সবাই যেন সবসময় এভাবেই মিলেমিশে থাকে— এটিই তার প্রার্থনা।
গৃহস্থালির কাজেও রয়েছে চমৎকার সমন্বয়। পরিবারের পুত্রবধূদের ভাষ্য, তারা পালাক্রমে করেন রান্না। তিন জা মিলে তিনবেলা করেন রান্না। কাজ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ নেই তাদের মধ্যে; বরং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই চলছে সংসার।
শুধু বিনন্দপুর নয়, আশপাশের এলাকায়ও এখন আর এমন একান্নবর্তী পরিবার চোখে পড়ে না। এ পরিবারটি এলাকার দৃষ্টান্ত। অনেকেই আসেন পরিবারটির মানুষদের দেখতে। জানতে চান কীভাবে এত বড় পরিবার একসঙ্গে এত বছর ধরে টিকে রয়েছে— জানালেন স্থানীয় বাসিন্দারা।




