৫ চিকিৎসকের কাঁধে দুই লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হাসপাতালের বারান্দায় মেঝেতে শুয়ে স্যালাইন নিচ্ছেন রোগীরা। কারও ঠাঁই হয়েছে ওয়ার্ডের এক কোণে, কেউ আবার স্বজনের বিছানো চাদরের ওপর চিকিৎসা নিচ্ছেন। অন্যদিকে চিকিৎসকের কক্ষের সামনে দীর্ঘ লাইন। রোগীর হাতে প্রেসক্রিপশন কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য ছুটতে হচ্ছে বাইরের ফার্মেসিতে। এমনই এক সংকটময় চিত্র এখন বরগুনার বেতাগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের।
প্রায় দুই লাখ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতাল। অথচ ২৮ জন চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র পাঁচজন। চিকিৎসক, জনবল ও ওষুধ সংকটের পাশাপাশি দীর্ঘ দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে নতুন হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ। ফলে চিকিৎসাসেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
হাসপাতাল সূত্র বলছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ১৭২টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে ৮৪টি পদ। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা চিকিৎসক সংকটে।
হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা জুনিয়র কনসালটেন্টের ১১টি পদের সবগুলোই শূন্য। সহকারী সার্জনের ১২টি পদের মধ্যে ৮টি দীর্ঘদিন ধরে খালি। ফলে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি অ্যান্ড অবস, অর্থোপেডিক্স, নাক-কান-গলা, চক্ষু, কার্ডিওলজি, শিশু, চর্ম ও যৌনরোগ এবং অ্যানেসথেসিওলজি—কোনো বিভাগেই বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই।
ফলে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মাত্র পাঁচজন চিকিৎসককে। একজন চিকিৎসককে অল্প সময়ের মধ্যে অসংখ্য রোগী দেখতে হচ্ছে। এতে রোগীরা যেমন পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন না, তেমনি চিকিৎসকদের ওপরও বাড়ছে মানসিক ও পেশাগত চাপ।
হাসপাতালের অবকাঠামোগত অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণের জন্য পুরোনো ভবন ভেঙে ফেলা হলেও গত দেড় বছর ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে বর্তমানে একটি ছোট ভবনে মাত্র ৩৩টি শয্যা নিয়ে ইনডোর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অথচ হাসপাতালটির অনুমোদিত শয্যা সংখ্যা ৫০।
শয্যা সংকটের কারণে প্রতিদিনই রোগীদের একটি বড় অংশকে বারান্দা কিংবা মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা—সব মৌসুমেই একই দুর্ভোগ। অনেক সময় মেঝেতেও জায়গা না পেয়ে দরিদ্র রোগীরা চিকিৎসা না নিয়েই বাড়ি ফিরে যান।
হাসপাতালের বহির্বিভাগেও প্রতিদিন গড়ে ২০০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু চিকিৎসক ও ওষুধ সংকটের কারণে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না।
রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকট রয়েছে। বহির্বিভাগে আসা রোগীদের সামান্য কিছু ওষুধ দেওয়া হলেও অধিকাংশ ওষুধই বাইরে থেকে কিনতে হয়। একই অবস্থা ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রেও। হাসপাতালের শয্যায় চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বজনদের প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে বাইরের ফার্মেসিতে ছুটতে হচ্ছে।
হাসপাতালে ভর্তি এক রোগীর স্বজন মো. দেলোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘হাসপাতালে রোগী ভর্তি করলেই একটা কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হয়। ওষুধ কিনতে হয় বাজার থেকে। তাহলে সরকারি হাসপাতালে এসে সাধারণ মানুষের লাভ কী?’
ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থাও জনবল সংকটে বিপর্যস্ত। ফার্মাসিস্টের দুটি পদের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ফলে ওষুধ বিতরণ কার্যক্রমেও সৃষ্টি হচ্ছে নানা জটিলতা।
শুধু হাসপাতাল নয়, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাও মারাত্মক সংকটে পড়েছে। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য সহকারীর ৩০টি পদের মধ্যে ১১টি পদ শূন্য। এতে টিকাদান কর্মসূচি, মা ও শিশুস্বাস্থ্য সচেতনতা এবং বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলার ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। কাউনিয়া উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট ও উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদই শূন্য। এছাড়া বেতাগী, সরিষামুড়ী, মোকামিয়া, কাজিরাবাদ, হোসনাবাদ ও বিবিচিনি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের ছয়টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। অর্থাৎ পাঁচটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র কার্যত চিকিৎসকশূন্য অবস্থায় চলছে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ সামান্য জ্বর, ব্যথা কিংবা প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যও উপজেলা সদরে ছুটতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রশাসনিক ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার অবস্থাও করুণ। অফিস সহায়কের চারটি পদের সবকটিই শূন্য। কুক বা রাঁধুনির দুটি পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পাঁচটি পদের মধ্যে দুটি শূন্য থাকায় হাসপাতালের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। টয়লেট ও হাসপাতাল চত্বরে দুর্গন্ধ ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। ওয়ার্ড বয়ের তিনটি পদের মধ্যে দুটি শূন্য থাকায় রোগীদের ট্রলি বা স্ট্রেচারে আনা-নেওয়ার কাজেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্বজনদের।
বেতাগী উপজেলা নাগরিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মহসীন খান বলেছেন, ‘বেতাগী হাসপাতালের এই চরম অব্যবস্থাপনা ও জনবল সংকট এখন এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। একটি সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, ওষুধ পাওয়া যায় না, এমনকি বসার জায়গাটুকুও নেই। দেড় বছর ধরে নতুন ভবনের কাজ বন্ধ পড়ে আছে। অথচ কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আমরা অবিলম্বে জনবল সংকট দূর এবং বন্ধ থাকা ভবনের নির্মাণকাজ চালুর দাবি জানাচ্ছি।’
বেতাগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. সাইফুল ইসলাম বলেছেন, ‘জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য নিয়মিত চাহিদা পাঠানো হচ্ছে। সীমিত জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। নতুন ভবনের কাজ দ্রুত শেষ হলে এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে সেবার মান আরও উন্নত হবে।’
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ্দাম হোসেন বলেছেন, ‘নতুন ভবন নির্মাণকাজ বন্ধ থাকা এবং জনবল সংকটের বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। গ্রামীণ ও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। বন্ধ থাকা উন্নয়নকাজ দ্রুত চালু করা এবং শূন্য পদগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল পদায়নের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বেতাগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখন নিজেই যেন চিকিৎসার প্রয়োজন অনুভব করছে। দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগ, ওষুধ সরবরাহ বৃদ্ধি এবং বন্ধ থাকা ভবন নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু না হলে উপকূলীয় এ অঞ্চলের লাখো মানুষ আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।






