রাজশাহীতে কমেছে পদ্মার প্রবাহ ও গভীরতা
চার দশকে আয়তন অর্ধেক
- ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অব্যবস্থাপনার ফলে পদ্মা তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে ধীরে ধীরে হয়ে পড়ছে সংকুচিত
- ১৯৮৪ সালের তুলনায় আয়তন কমেছে ৫০ শতাংশ, পানির গভীরতা কমেছে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং প্রবাহ কমেছে ২৬ দশমিক ২ শতাংশ
- ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি পানিপ্রবাহ ছিল ৯০,৭৩০ কিউসেক, যা ২০২৪ সালের একই দিনে নেমে আসে ৭৫,৪০৯ কিউসেকে। এক বছরে প্রবাহ কমেছে ১৫,৩২১ কিউসেক

চার দশকে অর্ধেকে নেমে এসেছে পদ্মা নদীর আয়তন, কমেছে প্রবাহ ও গভীরতা। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণের সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত পরিবেশ ও জনজীবনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহার, দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তন এবং অব্যবস্থাপনার ফলে পদ্মা তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে ধীরে ধীরে হয়ে পড়ছে সংকুচিত।
‘বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গঙ্গা নদীর পদ্মা শাখায় জীববৈচিত্র্য: সংরক্ষণবিষয়ক সুপারিশ’ শীর্ষক প্রকাশিত গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এ পরিসংখ্যান। গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালের তুলনায় শুকনো মৌসুমে রাজশাহী অংশে পদ্মার আয়তন কমেছে ৫০ শতাংশ, গভীরতা কমেছে ১৭ দশমিক ৮ এবং পানির প্রবাহ কমেছে ২৬ দশমিক ২ শতাংশ। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন এলাকায় মিঠাপানির সরবরাহ কমেছে প্রায় ৯০ শতাংশ। গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে উজানে পানি নিয়ন্ত্রণ, পলি জমা এবং মানুষের হস্তক্ষেপ মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের শুরু উজানে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর থেকে। ১৯৭৫ সালে গঙ্গার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এই বাঁধ চালু করা হয়, কলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষা করা যার মূল উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এরপর থেকে শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশ অংশে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাজশাহী অঞ্চলের পদ্মা নদীতে।
ফলে রাজশাহী অঞ্চলে পদ্মার বর্তমান চিত্র যেন এক মরুভূমির প্রতিচ্ছবি। একসময়ের প্রমত্তা নদীর বুক জুড়ে এখন ধু ধু বালুচর। বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় পানি থাকে না নদীতে। বছরে মাত্র এক থেকে দুই মাস নদীতে পানি থাকে, বাকি সময় নদীতে জেগে থাকে বিস্তীর্ণ চর।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা নদীতে ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি পানিপ্রবাহ ছিল ৯০ হাজার ৭৩০ কিউসেক, যা ২০২৪ সালের একই দিনে নেমে আসে ৭৫ হাজার ৪০৯ কিউসেকে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রবাহ কমেছে ১৫ হাজার ৩২১ কিউসেক। আর ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের হাইড্রোলজিক্যাল পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী নদীর পানিপ্রবাহ কিছুটা বাড়ে এবং বিভিন্ন যৌথ পর্যবেক্ষণ স্টেশনে এটি ওঠানামা করে ৮০-৮৬ হাজার কিউসেকের মধ্যে। তবে এই বৃদ্ধি সত্ত্বেও পানিপ্রবাহ ২০২৩ সালের স্তরের সমান হয়নি।
একই সময়ে গড় বৃষ্টিপাত ১৯ দশমিক ২ শতাংশ কমে গেলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীতে পানিপ্রবাহের দীর্ঘমেয়াদি পতনের প্রধান কারণ বৃষ্টিপাত নয়; বরং উজানে পানি নিয়ন্ত্রণ ও প্রত্যাহার। বিশেষ করে, ফারাক্কা বাঁধ থেকে প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ।
নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে তলদেশে দ্রুত পলি জমছে, যা নদীর গভীরতা ও নাব্য কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে পদ্মার সঙ্গে যুক্ত মহানন্দা, আত্রাই, পুনর্ভবা ও বারনই নদীগুলো প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। সংযুক্ত খাল-বিল ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও ক্রমে নিচে নেমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের পানিসংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নদীর এই পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে জীববৈচিত্র্যে। একসময় পদ্মায় দেখা যেত ডলফিন, কিন্তু এখন তা প্রায় বিলুপ্ত। ঘড়িয়ালও আর দেখা যায় না। কয়েক প্রজাতির মাছ এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে এবং আগের মতো ইলিশের ঝাঁকও আর আসে না। ফলে নদীকেন্দ্রিক জেলে সম্প্রদায়সহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা জীবিকা হারিয়ে পড়েছেন মারাত্মক সংকটে।
সম্প্রতি রাজশাহীতে ফারাক্কার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে আরও ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। বৈঠকে জানানো হয়, গঙ্গাসহ শতাধিক অভিন্ন নদীর পানি অন্যায্যভাবে প্রত্যাহারের ফলে উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি কৃষক সেচের পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একইভাবে দেশের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের প্রায় চার কোটি মানুষ পানিসংকটে পড়েছেন। গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প এলাকায় পানির অভাবে ৬৫ শতাংশ জমিতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।
বৈঠকে আরও জানানো হয়, বরেন্দ্র অঞ্চলের অকেজো হয়ে পড়েছে প্রায় সব গভীর নলকূপ। আর কার্যকারিতা হারিয়েছে ২১ শতাংশ অগভীর নলকূপ। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার পাশাপাশি আর্সেনিক দূষণের কারণে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকায় নলকূপের পানি পানযোগ্য নয়।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিজবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান বললেন, ‘ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে পদ্মার পানির স্তর কমে যাওয়ায় এর সঙ্গে সংযুক্ত নদীগুলো দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ছে এবং ভেঙে পড়ছে সামগ্রিক জলব্যবস্থা।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ‘নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারছে না। ফলে একদিকে দীর্ঘমেয়াদি খরা, অন্যদিকে বাড়ছে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি।’
নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর মতে, ফারাক্কার প্রভাবে এ অঞ্চলের মানুষ চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছেন এবং ন্যায্য পানিবণ্টন নিশ্চিত করা এখন জরুরি। পানিবণ্টন নিয়ে নতুন চুক্তি হলে তাতে শক্তিশালী গ্যারান্টি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর জানালেন, বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী কিছু পানি পাওয়া গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতে নতুন পানি চুক্তি হলে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে বলে তিনি আশা করেন।




