কুড়িগ্রামেই কেন সার নিয়ে এত শোরগোল
- কুড়িগ্রামে বন্যা না হওয়ায় বেড়েছে জমি চাষের পরিমাণ
- প্রয়োজনমতো সার পাচ্ছেন না কৃষক। নেই কৃষকের সঠিক হিসাব
- বিলম্বের কারণে বাড়ছে হট্টগোল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সার নিয়ে শোরগোল এখন উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিদিন জেলার ৯টি উপজেলার কোথাও না কোথাও হচ্ছে সার নিয়ে হট্টগোল, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। এমনকি ঘটছে কৃষি কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ হওয়ার মতোও ঘটনা। ক্রমেই বাড়ছে সার ডিলার আর কৃষকদের মধ্যে দূরত্ব।
কৃষি বিভাগ বলছে, সার না পাওয়ার আশঙ্কা থেকেই ঘটছে এমন ঘটনা। তবে ডিলার, কৃষক আর কৃষি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, সার না পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে মোটা দাগে দুটি কারণে। একদিকে কৃষি বিভাগের কাছে নেই ওয়ার্ডওয়ারি কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ের কৃষকদের তালিকা। বন্যা না হওয়ার কারণে চরে আবাদি জমি বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে সারের চাহিদা। অন্যদিকে ডিলারদের বিরুদ্ধে রয়েছে সার বিতরণে অব্যস্থাপনা আর কারচুপির অভিযোগ।
জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত চাষাবাদ ও কৃষকদের বাড়তি চাহিদার কথা বিবেচনায় সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক বরাদ্দের বাইরে আরও ১ হাজার টন ইউরিয়া সার বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। দুই দফায় পৃথক আদেশে এ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসের গড় বরাদ্দের তুলনায় এবারই সর্বোচ্চ পরিমাণ ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে কুড়িগ্রামে মোট ইউরিয়া সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার ৪৮৩ টন। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরেই নিয়মিত বরাদ্দ রয়েছে ৪ হাজার ৬৪৪ টন। গত বছর একই মাসে বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৮৯৪ টন।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় আমন ধানের চারা বর্তমানে গাঢ় সবুজ রঙ ধারণ করেছে। এখন ইউরিয়া কিংবা ডিএপি সার প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। তবে কৃষকদের মধ্যে অতিরিক্ত সার প্রয়োগের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সার সংকটের আশঙ্কায় ভুট্টা চাষের জন্য আগাম সার সংগ্রহ করে মজুদ করছেন।
সরেজমিনে জেলার পাঁচটি সার ডিলার পয়েন্টে অন্তত ২০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তাদের অভিযোগ, প্রয়োজনমতো সার পাচ্ছেন না তারা। কেউ কেউ পেলেও তা চাহিদার তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগ। আইডি কার্ড নিয়ে যেভাবে সার বিতরণ করা হচ্ছে, তাতে স্বজনপ্রীতিও চলছে। আবার অনেক কৃষক দাবি করেছেন, খোলাবাজার কিংবা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সার বিতরণের।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের কৃষক মাহতাব বললেন, ‘সার কিনতে আসছি সকাল বেলা, আইডি কার্ড জমা দিছি— এখন দুপুর পর্যন্ত আর সার পাইলাম না।’ মাহতাব এবার তিন বিঘা জমিতে আমনের আবাদ করেছেন। তার দাবি, জমিতে তিনি এখন পর্যন্ত এক মুঠো সারও দিতে পারেননি। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বললেন, ‘আবাদ পোড়া দিমো এবার।’
একই উপজেলার ঘোগাদহ ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল আউয়াল দেড় বিঘা জমিতে করেছেন আমনের আবাদ। তিনি জানালেন, অনেক তয়-তদবির করে জমিতে একবার দিয়েছেন সার। তবে শীষ আসার আগে তার জমির জন্য প্রয়োজন আরও ১২ কেজি সার। তবে সারাদিন পার করে তিনি ফিরছেন খালি হাতে। ‘যে শুনি সার আছে, কিন্তু সার তো পাই না। আর তোমাক কয়া কী হয়?’ ক্ষোভ ঝাড়লেন তিনি। তবে রফিকুল ইসলামের কপাল ভালো। ৬ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে পেয়েছেন সাড়ে ১৬ কেজি সার। তার প্রয়োজন প্রায় ২ মণ।
রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ারডাঙ্গা ইউনিয়নের কৃষক আবেদ আলীর মতে, আগে এ সমস্যা হতো না। এখন হচ্ছে তার অন্যতম কারণ, কোনো শৃঙ্খলা নেই। একই সঙ্গে খোলাবাজারে যদি কিছু সার পাওয়া যেত, তাহলে ডিলার পয়েন্টে চাপ কমত। তিনি খোলাবাজারে ন্যায্যমূল্যে সার বিক্রির দাবি জানিয়েছেন।
কী বলছে কৃষি বিভাগ ও জেলা প্রশাসন: কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বছর বন্যা না হওয়ায় চরাঞ্চলের কিছু নিচু জমিও চাষাবাদের উপযোগী হয়েছে। কৃষকরা এসব জমিতে বিলম্বে আমন এবং রবি মৌসুমের আগাম সবজি চাষ শুরু করেছেন। ফলে এসব এলাকায় সারের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সরকার অতিরিক্ত ইউরিয়া সার বরাদ্দ দিয়েছে। শিগগিরই এসব সার কৃষকদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করা হবে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বললেন, ‘অতিরিক্ত ১ হাজার টন ইউরিয়া বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অক্টোবর মাসের নিয়মিত বরাদ্দের ৩ হাজার ৬৩৯ টন সার আগাম উত্তোলনের অনুমতিও পাওয়া গেছে। সারের কোনো কমতি হবে না। কৃষকদের আশ্বস্ত করতে চাই, রবি মৌসুমেও সারের কোনো সংকট হবে না। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রয়েছে।’
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানালেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) থেকে জারি করা বরাদ্দ আদেশে ৫০০ এবং ১৭ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখা থেকে আরও ৫০০ টন ইউরিয়া সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক বরাদ্দের অতিরিক্ত হিসাবে কুড়িগ্রাম জেলার জন্য দুই দফায় ১ হাজার টন ইউরিয়া বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
তবে গত ২০ সেপ্টেম্বর সার বিতরণবিষয়ক মতবিনিময় সভায় কৃষি বিভাগকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘কুড়িগ্রামে তিন-চার বছর ধরে বন্যা হয়নি, সেহেতু কৃষির আবাদি জমির পরিমাণ বেড়ে গেছে। এ তথ্যটা কৃষি বিভাগের কাছে আছে; কিন্তু তারা সে তথ্য কেন্দ্রে জানাতে পারেনি। সার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের যারা ব্লক সুপাইভাইজার আছেন, তাদের তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। তাদের কয়েকবার বলেছি বিষয়টি, তারা এখন থেকে আরও সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।’



