হরিরামপুরে অনুমোদনহীন বেকারি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে খাবার

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও খালি গায়ে বেকারিতে তৈরি হচ্ছে খাবার
মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে অনুমোদন ও ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে অন্তত ১১টি বেকারি। এসব বেকারিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কেক, পাউরুটি, বিস্কুট, চানাচুরসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করে বাজারজাত করা হচ্ছে। কোনো কোনো বেকারির শুধু প্রিমিসেস সনদ থাকলেও বিএসটিআই, ট্রেডমার্ক, পরিবেশ, আয়কর-ভ্যাট ও মেডিকেল সনদসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য অনুমোদন নেই। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা হলেও প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ও নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক মো. আতোয়ার রহমান জানান, হরিরামপুরে মোট ১১টি বেকারি রয়েছে। এগুলো হলো বাল্লা এলাকার আহাদ বেকারি, ঝিটকা এলাকার নয়ন বেকারি ও ইমন বেকারি, ঝিটকা বাসুদেবপুর এলাকার শাহিন স্পেশাল ঝাল চানাচুর, ঝিটকা গোয়ালবাগ এলাকার ভাই-বোন বেকারি, লেছড়াগঞ্জ বাজারের তৃষা-ছোঁয়া বেকারি, কাণ্ঠাপাড়ার মদিনা বেকারি, বলড়া বাজারের মিন্টু বেকারি ও গৌতম বেকারি এবং পদ্মা নদীর চরাঞ্চলের জালাল বেকারি ও হায়াত আলী বেকারি। এর মধ্যে কয়েকটির শুধু প্রিমিসেস সনদ রয়েছে। তবে কোনোটিরই বিএসটিআই সনদ, ট্রেডমার্ক, পরিবেশ, মেডিকেল সনদসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য সনদ ও ছাড়পত্র নেই।
সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি বেকারি ঘুরে দেখা যায়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শ্রমিকেরা কেক, বিস্কুট, পাউরুটি ও চানাচুর তৈরি করছেন। অনেক শ্রমিককে হাতে গ্লাভস ছাড়াই ময়দা মাখতে দেখা যায়। কেউ কেউ খালি গায়ে কাজ করছেন। ঘামে ভেজা শরীর নিয়েই খাদ্য তৈরির কাজ করছেন শ্রমিকেরা। ময়দা প্রস্তুতের সময় শ্রমিকদের কপাল ও মুখ থেকে ঘাম ঝরে ময়দার মধ্যে পড়ছে। আবার কাউকে এক হাতে ধূমপান এবং অন্য হাতে কাজ করতেও দেখা গেছে। খোলা পরিবেশে উৎপাদন করায় ধুলাবালুও খাবারের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ কমাতে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। খাবারে বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল ও ভেজাল রং ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। বেশিরভাগ পণ্যের মোড়কে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ও মূল্য উল্লেখ করা হয় না। ফলে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ এসব খাদ্যপণ্য খেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
বাল্লা এলাকার আহাদ বেকারির পরিচালক কবির হোসেন প্রথমে দাবি করেন, তাদের বেকারির প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র রয়েছে। তবে কাগজপত্র দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। পরে তিনি জানান, বেকারিটির মূল মালিক কুশিয়ারচর এলাকার ফরিদুল ইসলাম। তার কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে তিনি বেকারিটি পরিচালনা করছেন।
ভাই-বোন বেকারির মালিক হবি মিয়া বলেন, ‘আমাদের শুধু খাদ্য লাইসেন্স আছে। প্রতিবছর জুনে অফিস থেকে লোক এসে দিয়ে যায়।’
তৃষা-ছোঁয়া বেকারির এক শ্রমিক বলেছেন, ‘সারাদিন আমাদের এই কাজের ওপরেই থাকতে হয়। এর জন্য হ্যান্ড গ্লাভস পরা হয় না। তবে আমাদের হ্যান্ড গ্লাভস আছে। আর এত নিয়মনীতি মেনে কাজ করা যায় না। নিয়ম ধরলে বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে।’
উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ও নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক মো. আতোয়ার রহমান বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেটরা সময় দিতে পারেন না। আমি পুলিশের সহযোগিতা চাইলে আইন অনুযায়ী তারা দিতে বাধ্য। তবে অনেক সময় তারাও নানা কাজের জন্য ফোর্স দিতে পারে না। এর জন্যই অবৈধ বেকারির বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে অভিযান পরিচালনা সম্ভব হয় না।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কাজী এ কে এম রাসেল বলেছেন, ‘নোংরা পরিবেশে খাবার উৎপাদন করলে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ হতে পারে। খাবারে পোশাকের রং ও কেমিক্যাল ব্যবহার করলে সেটা ক্যান্সারজনিত রোগের কারণ হতে পারে। এসব খাবার খেলে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। সর্বোপরি স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকছেই।’
বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক (সিএম) মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম জানান, ‘আমাদের নিয়মিত সার্ভিলেন্স-মনিটরিং চালু আছে। আমরা প্রতি মাসে উপজেলাভিত্তিক মোবাইল কোর্টের শিডিউল দেই। আমাদের মোবাইল কোর্টও চালু আছে।’
এ বিষয়ে হরিরামপুর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফাহিজা বীসরাত হোসেন বললেন, ‘অবৈধ বেকারির বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান চলমান রয়েছে। কিছুদিন আগেও একটি বেকারিকে জরিমানা করা হয়েছে। খুব দ্রুতই আমরা আবার অভিযান পরিচালনা করব।’








