মেঘ-বৃষ্টির লুকোচুরি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন, ত্যাগের আনন্দে উজ্জ্বল সিলেট

ছবি: আগামীর সময়
মেঘলা আকাশ আর হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টির চোখ রাঙানি ছিল সকাল থেকেই। কিন্তু তা উপেক্ষা করেই উৎসবের আমেজে মেতে উঠেছে পুরো সিলেট। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, সম্প্রীতির মেলবন্ধন আর ত্যাগের মহিমায় মুখরিত সিলেট নগরী ও এর আশপাশের এলাকা। নতুন পোশাকে শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস, পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি আর চিরচেনা ভ্রাতৃত্বের কোলাকুলিতে পুরো অঞ্চলে তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
আজ বৃহস্পতিবার সিলেটে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ ময়দানে। এর বাইরেও সিলেট নগর ও জেলা জুড়ে ২ হাজার ৭০৬টি ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে শুধু মহানগর এলাকাতেই ছিল ৩৯৬টি জামাত। নামাজ শেষে এক ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে হাত তোলেন লাখো মুসল্লি। মোনাজাতে দেশ, জাতি ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। এরপরই চেনা-অচেনা সব ভেদাভেদ ভুলে একে অন্যকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঈদের শুভেচ্ছা ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা ছড়িয়ে দেন মুসল্লিরা।
এর আগে ঈদকে কেন্দ্র করে সিলেটের পশুর হাটগুলোতেও ছিল উপচেপড়া ভিড়। কাজিরবাজার, খাদিমনগর, দক্ষিণ সুরমা ও মিরাপাড়ার মতো স্থায়ী-অস্থায়ী হাটগুলোয় এবার দেশি গরু ও ছাগলের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। শেষ মুহূর্তের বেচাকেনায় হাটগুলো জমে উঠেছিল কানায় কানায়। বড়দের পাশাপাশি পছন্দের পশু কিনতে হাটে শিশুদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
ঈদের নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হয় উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা—পশু কোরবানি। নগরের বিভিন্ন চত্বর, বাড়ির আঙিনা ও নির্ধারিত স্থানগুলোতে ধর্মীয় বিধান মেনে কোরবানি সম্পন্ন করা হয়। এরপর কোরবানির মাংসের একটি বড় অংশ আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং দুস্থ ও দরিদ্র মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে সমাজের সব স্তরের মানুষের মধ্যে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াকে ঘিরে কসাই ও তাদের সহকারীদের কাটছে ভীষণ ব্যস্ত সময়।
উৎসবের এই আনন্দের পাশাপাশি এবারের ঈদে পরিবেশের পরিচ্ছন্নতাকে দেওয়া হয়েছে বিশেষ অগ্রাধিকার। কোরবানি শেষ হতে না হতেই পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করতে সিলেট সিটি করপোরেশনের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়। এই কাজে সিসিকের অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পাশাপাশি নগরের একঝাঁক তরুণ স্বেচ্ছাসেবীও মাঠে নেমেছেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে সাধারণ মানুষকে নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিবেশ দূষণ ও জনদুর্ভোগ এড়াতে বর্জ্য অপসারণের পর পরই পুরো নগরীতে দ্রুত জীবাণুনাশক ছিটানোর সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
এদিকে, সিলেটবাসীর ঈদ উদযাপনকে নির্বিঘ্ন ও সম্পূর্ণ নিরাপদ করতে পুরো নগর ও জেলা জুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা চোখে পড়েছে। প্রধান প্রধান ঈদগাহ, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মানুষের সমাগমস্থলগুলোয় পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
সব মিলিয়ে এবারের ঈদুল আজহা সিলেটবাসীর মনে এনে দিয়েছে এক অন্যরকম স্বস্তি ও মানবিকতার অনুভূতি। উৎসবের এই ক্ষণে কেউ যেমন প্রিয়জনদের পাশে পেয়ে আনন্দে ভাসছেন, আবার কেউ কেউ দূর পরবাসে থাকা স্বজনদের অনুপস্থিতি অনুভব করে কিছুটা আবেগপ্রবণও হয়ে পড়েছেন। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ত্যাগ, ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও পরিচ্ছন্নতার এক অনন্য বার্তা নিয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে আধ্যাত্মিক এই নগরী।






