চকরিয়া
বন্যা শেষে সর্বত্র ছড়িয়ে নদীভাঙনের নির্মম চিহ্ন

ছবি: আগামীর সময়
বন্যার পানি নেমে গেলেও কক্সবাজারের চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীপাড়ের মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। কয়েক দিনের প্রবল স্রোতে বহু পরিবারের ঘরবাড়ি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গৃহহীন হয়ে পড়া মানুষের দাবি, ত্রাণে দু-চার দিনের ক্ষুধা মিটলেও টেকসই বাঁধ নির্মাণ না হলে আগামী বর্ষায় আবারও একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
আজ মঙ্গলবার বিকালে চকরিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব কোচপাড়া, বাঁশঘাটা, কোচপাড়াসহ মাতামুহুরী নদীতীরবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বন্যার পানি কমে গেলেও সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে নদীভাঙনের নির্মম চিহ্ন। কোথাও ভাঙা ঘরের টিন, কোথাও কাঠ, কোথাও ধসে পড়া উঠান। অনেক পরিবার শেষ সম্বলটুকু উদ্ধার করতে ভাঙা ঘর থেকে টিন, কাঠ ও আসবাবপত্র খুলে নিচ্ছেন। তবে সেগুলো কোথায় নিয়ে যাবেন, সেই উত্তরও তাদের জানা নেই। কারণ অনেকের ক্ষেত্রেই ঘরের সঙ্গে নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে বসতভিটাও।
নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে নিজের বিলীন হয়ে যাওয়া ভিটার দিকে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে স্মৃতিচারণ করছিলেন তাসমিন জন্নাত। তিনি বলেছেন, ঢলের পানি চলে গেছে, কিন্তু আমাদের সবকিছু নিয়ে গেছে। আমার স্বামী বাজারে সবজি বিক্রি করে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে এই ঘরটি করেছিলেন। চোখের সামনে সেই ঘর নদীতে তলিয়ে গেল। কিছুই করতে পারলাম না। এই কষ্ট কোনো দিন ভুলতে পারব না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শুধু তাসমিন জন্নাতই নন, পূর্ব কোচপাড়ার নুরুল আবছার, নুরুল হুদা, নুরুল ইসলাম, আমির উদ্দিন, ওসমান, আব্দুল আজিজ পুতু ও মানিকসহ শতাধিক পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। অনেকের ঘর এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে, আবার অনেক পরিবার এখনো ভাঙনের ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছে। আতঙ্কে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন নদীতীরের বাসিন্দারা। গৃহহীন পরিবারের কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে, কেউ খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন।
নদীপাড়ের বাসিন্দা রাবেয়া বেগম বললেন, ত্রাণে দু-চার দিনের ক্ষুধা মিটবে, কিন্তু টেকসই বাঁধ না হলে আগামী বর্ষায় আবারও ঘর হারাব। আমরা সরকারি চাল-ডাল চাই না, চাই এমন একটি স্থায়ী বেড়িবাঁধ, যাতে প্রতি বর্ষায় পথে বসতে না হয়।
পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মুজিবুল হক বলেছেন, মাতামুহুরী নদীর তীব্র ভাঙনে পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাঁশঘাটা, কোচপাড়া, পূর্ব কোচপাড়া এবং মজিদিয়া দারুচ্ছুন্নাহ্ পৌর দাখিল মাদ্রাসাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা হুমকির মুখে রয়েছে।
তার ভাষ্য, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন করেছেন। প্রতিবারই নদীভাঙন রোধে প্রকল্পের আশ্বাস দেওয়া হলেও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষায় ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবার ভাঙনের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটায়।
এ বিষয়ে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম বললেন, মাতামুহুরী নদীর ভাঙন রোধে একটি প্রকল্প প্রস্তুতের কাজ চলছে। জিওব্যাগের পরিবর্তে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি কার্যকর সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ঢাল নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।





